প্রবীণ সাংবাদিক আলিমুজ্জামান হারুন: সত্য ও সততার চার দশকের গৌরবময় পথচলা
বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে কিছু ব্যক্তিত্ব কেবল সংবাদ পরিবেশনের জন্যই স্মরণীয় হন না, বরং সত্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা ও বস্তুনিষ্ঠ উপস্থাপনার মাধ্যমে তাঁরা হয়ে ওঠেন ইতিহাসের সাক্ষী। এই সারির এক উজ্জ্বল নাম প্রবীণ সাংবাদিক আলিমুজ্জামান হারুন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে গণমাধ্যমের জটিল ও চড়াই-উতরাই পূর্ণ পথ পেরিয়ে তিনি সততা, সাহস এবং জনস্বার্থের প্রশ্নে আপসহীনতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার নদীবিধৌত অঞ্চলে জন্ম নেওয়া আলিমুজ্জামান হারুনের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বরিশাল অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক আবহে। ছোটবেলা থেকেই বই পড়া, সমসাময়িক ঘটনাবলি সম্পর্কে খোঁজ রাখা এবং সমাজকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার অভ্যাস ছিল তাঁর। এই সহজাত কৌতূহল ও বিশ্লেষণাত্মক মনই পরবর্তীতে তাঁকে সাংবাদিকতার মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় টেনে আনে, যা তিনি কেবল জীবিকা হিসেবে নয়, বরং আজীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
তিনি ১৯৮২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকতা পেশায় পদার্পণ করেন, যখন বাংলাদেশের গণমাধ্যম এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তীব্র প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাধা থাকা সত্ত্বেও তিনি নির্ভীকভাবে সত্য অনুসন্ধানে নিজেকে নিয়োজিত করেন। মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ এবং তথ্যের উৎস যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তাঁর কঠোরতা খুব দ্রুত সহকর্মী ও পাঠকদের মাঝে তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। তিনি সবসময় বিশ্বাস করেন যে একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগণের আস্থা, আর সেই আস্থা অর্জনের একমাত্র উপায় হলো নির্ভীক, বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যপ্রমাণ-ভিত্তিক সাংবাদিকতা।
দীর্ঘ কর্মজীবনে আলিমুজ্জামান হারুন দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক ও গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কাজের পরিধিতে ছিল জাতীয় রাজনীতি, জনপ্রশাসন, জাতীয় নির্বাচন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং শিক্ষা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। তরুণ সাংবাদিকদের কাছে তাঁর কাজের পদ্ধতি একটি মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছিল; কারণ তিনি সর্বদা ঘটনার স্থানে সশরীরে উপস্থিত থাকা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে সরাসরি কথা বলা এবং নথিপত্র-ভিত্তিক পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানের ওপর জোর দিতেন। 'ব্রেকিং নিউজ'-এর এই যুগেও তিনি গতির চেয়ে তথ্যের নির্ভুলতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন, কারণ তিনি মনে করেন একটি ভুল বা যাচাইহীন সংবাদ পুরো সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা চিরতরে নষ্ট করে দিতে পারে।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে আলিমুজ্জামান হারুন বর্তমানে জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল লাস্টনিউজবিডি.কম-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর গতিশীল সম্পাদকীয় নেতৃত্বে পোর্টালটি দ্রুতগতির ইন্টারনেট সাংবাদিকতার সাথে কঠোর তথ্য-যাচাইয়ের এক চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়েছে। তিনি তাঁর সম্পাদকীয় টিমকে প্রায়শই মনে করিয়ে দেন যে গতির সাথে নির্ভুলতা বজায় রাখাই আধুনিক ডিজিটাল সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সাংবাদিকতার পাশাপাশি একজন লেখক ও গবেষক হিসেবেও তিনি অনন্য অবদান রেখেছেন। তাঁর বহুল প্রশংসিত বই "সাংবাদিকদের চোখে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিবাহিনী" সমসাময়িক বাংলাদেশি গণমাধ্যম ও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। বইটি পার্বত্য অঞ্চলের সেই উত্তাল সময়ের মাঠ পর্যায়ের বিপজ্জনক অভিজ্ঞতা এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছে।
নিউজরুমের বাইরেও তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সার্বিক কল্যাণে নিরলস কাজ করেছেন। শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক ইউনিয়ন ও সংগঠনগুলোর সাথে যুক্ত থেকে তিনি জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে জেনুইন সাংবাদিকতার অধিকার রক্ষা, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিতে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। একই সাথে একজন জ্যোষ্ঠ সংবাদ প্রতিনিধি হিসেবে তিনি বহু দেশ সফর করেছেন এবং উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলন, রাষ্ট্রীয় সফর ও বৈশ্বিক ঘটনাবলি কভার করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের দূরদর্শিতা তুলে ধরেছেন।
আজকের তরুণ প্রজন্মের সাংবাদিকদের কাছে আলিমুজ্জামান হারুনের জীবন ও কর্ম এক অনুকরণীয় আলোকবর্তিকা। সহকর্মীদের কাছে অত্যন্ত বিনয়ী, শৃঙ্খলাপ্রিয় ও স্নেহশীল মেন্টর হিসেবে পরিচিত হলেও, সত্য রক্ষার প্রশ্নে তিনি সবসময়ই আপসহীন ও দৃঢ়। চার doc বা চার দশকে তাঁর এই পথচলা বাংলাদেশের স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।

