কার স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা বিএনপির পররাষ্ট্রমন্ত্রী: নাহিদ
অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টাকে কেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তা নিয়ে আবারো প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
সোমবার বিকেলে চট্টগ্রামের একটি কমিউনিটে হলে এনসিপির বিভাগীয় সাংগঠনিক ইফতার মাহফিলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন।
সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম বলেন, “আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম, এই আধিপত্যবাদ কেবল ভারতীয় আধিপত্যবাদ না। বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যে পরাশক্তিই যাবে, সেই সকল আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই সংগ্রাম করে যাব।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও আমেরিকার যে দ্বন্দ্ব, যেখানে মুসলিম বিশ্বের নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে শহীদ করা হয়েছে, সেই প্রেক্ষিতে যে প্রেস রিলিজ দিয়েছে সেই প্রেস রিলিজ দেখে আমাদের খুবই কষ্ট লেগেছে।
“বাংলাদেশ আবার কোনো নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কবলে পড়ল কিনা, সেই প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।”
নাহিদ ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টাকে। কেন তাকে দায়িত্ব দেওয়া হল? কোনো পরাশক্তির স্বার্থ রক্ষার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হল?
“এই নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং এর পুরষ্কার হিসেবে দেওয়া হলো কিনা, সেই প্রশ্ন আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়নি। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এই প্রশ্ন পরিষ্কার করবে এটা আমাদের প্রত্যাশা থাকবে।”
‘পরিণতি করুণ হবে’
আদালতকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় ব্যবহারের চেষ্টা করা হলে ‘পরিণতি করুণ হবে’ বলে হুঁশিয়ার করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
এ বিষয়ে দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেনও একই বক্তব্য দিয়েছেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “বিচার, সংস্কার, দুর্নীতি ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আমাদের যে লড়াই, তা শেষ হয় নাই। এই লড়াই আমাদেরকে নতুন করে শুরু করতে হবে।
“জুলাই সনদ এবং জনগণের যে গণরায়, যার ভিত্তিতে নির্বাচন হয়েছে, যার ভিত্তিতে সরকার গঠিত হয়েছে সেই গণভোটের রায়কে বাতিল করার জন্য আদালতকে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আদালতকে আবারো দলীয়করণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “স্পষ্ট করে বলতে চাই, আদালতকে যদি রাজনৈতিক এজেন্ডার কারণে, নিজেদের দলীয় এজেন্ডার কারণে ব্যবহার করা হয়, চেষ্টা করা হয়, তার পরিণতি খুবই করুণ হবে। এই একই প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন শুরু হয়েছিল।
“ফলে এখন যারা সরকারে আছেন, আপনাদের প্রতি স্পষ্ট আহ্বান থাকবে, গণভোটের গণরায় দ্রুত বাস্তবায়ন করুন। এই গণরায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ, নতুন সরকারের ও সংসদের যাত্রা শুরু হোক।”
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “বাংলাদেশের হাই কোর্টে দুটি রিট করা হয়েছে। এই দুইটা রিটের মধ্যে দিয়ে জুলাই সনদ, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট, গণভোটের ফলাফল এবং সংবিধান সংশোধন পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণকে আজকে হাই কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
“এটা কোনো আইনের প্রশ্ন নয়। এটা প্রকৃত অর্থেই একটা পলিটিক্যাল প্রশ্ন।”
তিনি বলেন, “পৃথিবীর কোনো বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রশ্ন সমাধানের দিকে যায় না। কিন্তু আমরা খেয়াল করে দেখছি, বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে একটা জুডিশিয়াল স্টেটে পরিণত করার চক্রান্তের জায়গা থেকে পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেনকে কোর্টের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।”
আখতার হোসেন বলেন, “যখন কোটার সুরাহা নির্বাহী বিভাগের মাধ্যমে না করে শেখ হাসিনার সরকার কোর্টের দিকে ঠেলে দিল, তখনই বাংলাদেশের ছাত্র জনতা এই রায়ের বিপক্ষে রাজপথে নেমে এসেছিল। বাংলাদেশের পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেনগুলোকে যখনই কোর্টের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, দেশের পলিটিক্যাল অঙ্গনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
“আজকেও যে প্রশ্নগুলোর সুরাহা হয়ে গেছে, গণঅভুত্থ্যানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ তাদের রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটিয়েছে। অধিকন্তু গণভোটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ তাদের রাজনৈতিক অভিপ্রায় জানান দিয়েছে।”
তিনি বলেন, “বিএনপি যে পরিমাণ ভোট নিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে, তার দ্বিগুণ ভোটে গণভোট পাস হয়েছে। তারা টু থার্ড মেজরিটির বড়াই করছে। তাদের মনে রাখা প্রয়োজন, তাদের থেকেও বেশি বৈধতা গণভোটের, জুলাই সনদের ও জুলাই গণঅভুত্থ্যানের।”
‘তারুণ্যে শক্তিকে দমন করতে অপশক্তি কাজ করেছে’
জাতীয় নির্বাচনে ছয়টি আসনে এনসিপির জয় ‘সহজ ছিল না’ মন্তব্য করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “পৃথিবীর অনেক দেশের সাম্প্রতিক সময়ে যেখানে ছাত্র তরুণরা গণঅভুত্থ্যান নেতৃত্ব দিয়েছে। বেশিরভাগ দেশেই পুরনো বন্দোবস্ত, বিদ্যমান এস্টাব্লিসমেন্ট নতুন নেতৃত্বকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে দেয় নাই। একই ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটেছিল।
“৫ অগাস্টের পর থেকে এই তারুণ্যের শক্তিকে দমন করার জন্য নানান শক্তি অপশক্তি একসাথে কাজ করেছে। এই নির্বাচনে সর্বাত্মকভাবে রুখে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু জনগণের সহযোগিতায় ১১ দলের সমর্থনে এনসিপি সবাইকে অবাক করে দিয়ে ছয়টি আসন নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রবেশ করেছে।”
তিনি বলেন, “আপনারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেন। সাধারণ মানুষ ১১ দলকে যে ব্যাপক হারে ভোট দিয়েছিল, আমরা সেই ভোট ধরে রাখতে পারি নাই। সেই ভোট যদি আমরা সম্পূর্ণভাবে ধরে রাখতে পারতাম, নির্বাচনের ফলাফল অন্যরকম হত।
“যেটা জাতীয় নির্বাচনে আমরা পারি নাই, সেটা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা করে দেখাতে চাই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি অংশগ্রহণ করবে, আপনারা সেটার জন্য প্রস্তুতি নেন।”
‘শেখ হাসিনাকে কবে ফেরত আনবেন?’
ইফতার মাহফিলে আলোচনায় অংশ নিয়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছেন, শেখ হাসিনাকে কবে দেশে ফেরত আনা হবে।
পাটওয়ারী বলেন, “শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে আছে। আমরা দেখছি বিভিন্ন অ্যাম্বেসির সাথে মিটিং হচ্ছে। ভালো কথা, মিটিং করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্পষ্ট করতে হবে, শেখ হাসিনাকে আপনারা কবে ফেরত আনবেন।
“আমরা শেখ হাসিনাকে শহীদ ওয়াসিম, শহীদ আবু সাঈদ–উনাদের মা বাবার হাতে তুলে দিতে চাই। যে উনার ফাঁসি হয়েছে। ফাঁসির দড়িতে আপনারা টান দিয়ে শেখ হাসিনার ফাঁসি বাস্তবায়ন করেন।”
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “বাংলাদেশে আন্ডার টেবিল যদি কেউ শেখ হাসিনাকে নিয়ে আসতে চায়, আওয়ামী লীগকে সুযোগ করে দিতে চায়; এবং যারা আমাদের উপর গত ১৫ বছরে নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়েছিল, ভারতকে একচাটিয়া ব্যবসা বাণিজ্য দিয়েছিল, বাংলাদেশের মানুষের ওপর তাদের চাপিয়ে দিতে চায়…
“আমরা যারা তরুণ প্রজন্ম রয়েছি, আমাদের যারা সিনিয়র প্রজন্ম রয়েছেন, যারা আমাদেরকে গাইড করে থাকবেন, আমরা এক চুলও এটার জন্য প্রস্তুত নই। দরকার হয় আবার জুলাই হবে। কিন্তু আমরা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে কখনো মেন নেব না।”
অন্যদের মধ্যে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

