'দি কান্ট্রি টুডে'-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শহীদ আবু সাঈদের বাবা: ছেলের হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান
মো. মফিজ উদ্দিন সরকার, রংপুর
আগামীকাল ১৬ জুলাই, ২০২৬ ঐতিহাসিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদের দ্বিতীয় শাহাদাত বার্ষিকী। এই মহান আত্মত্যাগের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে 'দি কান্ট্রি টুডে'-এর পক্ষ থেকে শহীদ আবু সাঈদের পিতা মো. মকবুল হোসেনের একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়।
সাক্ষাৎকার চলাকালে তিনি রংপুর তথা দেশ কাঁপানো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত তাঁর সন্তান আবু সাঈদের হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। একই সাথে শোকাতুর এই প্রবীণ পিতা আশা প্রকাশ করেন যে, কোটা বৈষম্যের মতো বিষয়ের কারণে দেশে যেন আর কোনো তরুণের তাজা প্রাণ অকালে ঝরে না যায়।
মঙ্গলবার বিকেলে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মদনখালী ইউনিয়নের জাফরপাড়া বাবানপুর গ্রামে নিজ বাসভবনে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। বর্তমানে শহীদ আবু সাঈদের পিতা মো. মকবুল হোসেন বার্ধক্যজনিত ও বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতার কারণে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন।
কোটা আন্দোলনের শহীদ এবং আহত যোদ্ধাদের দায়ের করা বিভিন্ন মামলার আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এসব বিচারের ক্ষেত্রে আরও গতি আনা প্রয়োজন। প্রকৃত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো অপরাধী যেন আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে না যায়। তবে একই সাথে সরকার যেন সতর্ক থাকে, যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি বা সাধারণ মানুষ অনর্থক হয়রানির শিকার না হন। রাষ্ট্র এবং সমাজের পক্ষ থেকে একজন শহীদের পিতা হিসেবে তাঁকে যে সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হচ্ছে, তাতে তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট। দেশের সমৃদ্ধি ও শান্তিশৃঙ্খলা কামনা করে তিনি বলেন, কোটা সংস্কার নিয়ে যেন আর কখনো কোনো ক্ষোভ বা বৈষম্যের কথা শুনতে না হয়। দেশের প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ জন্য তিনি দেশবাসীর জন্য মন থেকে দোয়া করেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পার্কের মোড়ে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের যৌথ হামলার মুখে শিক্ষার্থীদের সাথে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সময় পুলিশের গুলিতে বীরদর্পে বুক পেতে দিয়ে নির্মমভাবে শহীদ হন আবু সাঈদ। পরদিন ১৭ জুলাই রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার জাফরপাড়া বাবানপুর গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
আবু সাঈদ ছিলেন বৈষম্যবিরোধী কোটা সংস্কার আন্দোলনে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক। তাঁর মৃত্যুর পর ১৭ জুলাই তাজহাট মেট্রোপলিটন থানায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করে। তাজহাট মেট্রোপলিটন থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় এই মামলার বাদী ছিলেন।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, দুপুর আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিটে ছাত্র নামধারী রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন দিক থেকে নির্বিচারে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও অস্ত্র দিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কনস্টেবল সোহেলের নেতৃত্বে একটি এপিসি গাড়ি থেকে ১৬৯ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করা হয়। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সে সময় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল।
মামলার এজাহারে আরও বলা হয়, "আন্দোলনকারীদের ইটপাটকেল ও গুলিবর্ষণের একপর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। সহপাঠীরা তাঁকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।" এই ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ২ থেকে ৩ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ওই বছরের ১২ আগস্ট মামলাটি পিবিআই-তে (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) স্থানান্তর করা হয়। তৎকালীন রংপুর জেলা পিবিআই-এর পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছিলেন। পিবিআই-এর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং বেরোবির তৎকালীন উপাচার্য (ভিসি) ড. হাসিবুর রশীদকে ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ অন্যান্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করেন।
এদিকে, রংপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের দ্বিতীয় শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভাগীয় শহর রংপুরে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে শহীদ দিবস এবং ৫ই জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালন করা হবে। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে আগামীকাল সকালে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত, শোক র্যালি, লাল ব্যাজ ধারণ, স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা ও স্মরণসভা এবং কেন্দ্রীয় মসজিদে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। বেরোবি আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান। বিশেষ অতিথি ও সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শহীদ আবু সাঈদের পিতা মোহাম্মদ মকবুল হোসেন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা। এ ছাড়া পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আশরাফুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন এবং দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. শওকত আলী।
পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে রংপুরের বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে গত সোমবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে একটি প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়, যাতে সভাপতিত্ব করেন রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন।

