ডার্ক মোড
Thursday, 13 June 2024
ePaper   
Logo
সকল জাতির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কেবলমাত্র জলবায়ুর ঋনাত্মক পরিবর্তন রোধ করতে পারে

সকল জাতির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কেবলমাত্র জলবায়ুর ঋনাত্মক পরিবর্তন রোধ করতে পারে

মমতাজুল ফেরদৌস জোয়ার্দার

নেতিবাচক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভূমণ্ডলের তাপমাত্রা উদ্বেগজনক-ভাবে বাড়ছে। আমাদের বিশ্ব দিন দিন উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে উঠছে। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বরফ গলছে অস্বাভাবিক হারে পক্ষান্তরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। ১৮৮০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা বেড়েছে ২১-২৪ সেন্টিমিটার। গত তিন দশকে, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে গড়ে ৩.১ মিলিমিটার। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে, ১৯৯৩ সালের একই মাসের তুলনায় সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা ৯৮ মিলিমিটার বেশি ছিল। climate.gov-এর রিপোর্ট অনুযায়ী এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাস ছিল শতাব্দীর সবচেয়ে উষ্ণতম ফেব্রুয়ারি মাস।

বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তিত হতে হতে বর্তমানে আমরা এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে পৌঁছে গেছি। জলবায়ুর এই হতাশা জনক ঋণাত্মক পরিবর্তনের কারণে নিম্নের দেশগুলো মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই বৈরী পরিস্থিতির কারণে যে সব দেশ সর্বোচ্চ ক্ষতির সম্মুখীন হবে তার মধ্যে মালদ্বীপ ও বাংলাদেশ অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের ভূমি সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে। এমনকি মালদ্বীপ সম্পূর্ণরূপে সমুদ্রে তলিয়ে যাবার আশঙ্কা আছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় যথোপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে পুরো বিশ্বকে বিপুল পরিমাণ শরণার্থীর চাপ বইতে হবে। স্বাভাবিক কারণেই ক্ষতিগ্রস্ত দেশের লোকজন অন্যান্য দেশের আশ্রয় নেবে।

ভূপৃষ্ঠের অস্বাভাবিক উষ্ণতা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ সমূহ:

ক) বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের অস্বাভাবিক মাত্রা বৃদ্ধি, খ) নির্বিচার বৃক্ষ নিধন, গ) পারমানবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ঘ) রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার, ঙ) জীবাণু অস্ত্রের পরীক্ষা, চ) জ্বালানির অপব্যবহার ও অপচয়, ছ) অপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন ও তা ক্রয়ে জনগণকে প্রলুব্ধ করা, জ) অবাধ পর্যটন।

বিশ্বের শিল্প উন্নত দেশগুলো মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নির্গমনের জন্য দায়ী। অথচ তারা জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে কোন ভ্রুক্ষেপই করছে না। জার্মানি একটা শিল্পোন্নত দেশ, দেশটি নির্ধারিত কার্বন নির্গমনের মাত্রার চেয়ে কম কার্বন উৎপাদন করে। কিন্তু তারা তাদের সাশ্রিত কার্বন মাত্রা অন্য দেশের কাছে বিক্রি করে। এই ব্যবসায়ী মনোভাব জার্মানির অর্থনীতিকে চাঙ্গা করলেও মানব কল্যাণ করে না। আর যে দেশ তা কেনে তাদের উচিত শক্তভাবে সকল নিয়ম মেনে কার্বন নির্গমন মাত্রা কমিয়ে আনা। কার্বন নির্গমনের ক্ষেত্রে সবথেকে আগ্রাসী অবস্থানে আছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত কিন্তু তারা জলবায়ুর পরিবর্তনের কোন তোয়াক্কা করে না।

জার্মানি পরিবেশ রক্ষার নৈতিকতায় নিজে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না কিন্তু ফ্রান্সের কাছ থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেনে। এটি ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। এই প্রক্রিয়া ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কূটকৌশলের একটি দিক। সবুজ দলকে খুশি রাখতেই তারা কাজটি করে। পরিবেশ দূষণ ও মাত্রাতিরিক্ত কার্বন উৎপাদনের জন্য শুধুমাত্র শিল্প উন্নত দেশগুলিই দায়ী তা নয়। এক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশগুলোও যথেষ্ট সচেতন নয়। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত দেশের একটি। কিন্তু তারাও যথেষ্ট সচেতন নয় জল-বায়ুর পরিবর্তন ও পরিবেশ নিয়ে। দেশটির জনগণ গাছ কাটতে কাটতে বন উজাড় করে ফেলেছে। অনেক এলাকা ‘বরেন্দ্র ভূমি’র মত আচরণ করছে। ওইসব এলাকায় এখন শীতের সময় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ও গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পরিলক্ষিত হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গা জেলা এর মধ্যে অন্যতম সেখানে এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে ৪২° সেলসিয়াসের উপরে তাপমাত্রা উঠে গেছে।

বাংলাদেশের যেসব বাড়িতে গ্যাসের মিটার নেই তারা অহেতুক সারাদিন গ্যাস জ্বেলে রাখে। এটা শুধু পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয় জাতীয় অপচয়ও বটে। যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করে। অহেতুক সরকারি কার্যালয়গুলোতে দিনের বেলা মোটা গাড় রঙের পর্দা টঙ্গিয়ে বাতি জেলে রাখে, তাও একটি নয় ৬/৭টি। গতবছর ঢাকাতে ইলেকশন কমিশন কার্যালয়ে আমি নিজে দেখেছি ব্যাপারটি। বাসা বাড়ি গুলোতেও একই অবস্থা। সেখানেও একাধিক বাতির ব্যবহার হচ্ছে যেখানে একটা বাতিই যথেষ্ট। প্রতিদিন যে পরিমাণ বিদ্যুতের অতিরিক্ত ব্যবহার শুধু ঢাকা শহরে হচ্ছে তা দিয়ে বিপুল পরিমাণ কল কারাখানা চালানো সম্ভব।

এছাড়াও সেখানে শিল্প কারখানা গুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোন নিয়ম নীতির ধার ধারে না। যন্ত্র-তন্ত্র নদী, খাল, বিল ও ক্ষুদ্র জলাশয়সহ যেখানে সেখানে কারখানার বর্জ্য ত্যাগ করে। গাড়ি মেরামত কেন্দ্রগুলো যেখানে সেখানে ‘পোড়া সিনথেটিক মোটর তেল’ সহ বিভিন্ন বর্জ্য ফেলে দিচ্ছে। তারা একবার ভেবেও দেখছে না এর প্রভাব কত ভয়াবহ। যে ভূমিতে তারা এগুলো ফেলছে সেই ভূমিতেই শস্য উৎপাদিত হচ্ছে। সে সব শস্যও এতে প্রভাবিত ও সংক্রামিত হচ্ছে। মাটির নিচের ও জলাশয়ের জল দূষিত হচ্ছে এ থেকে।

অথচ বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবেশ নিয়ে সারা বিশ্বে সোচ্চার। তিনি নিজে মিতব্যয়ী। তাঁর সরকারি বাসভবনে তিনি প্রচুর গাছপালা লাগিয়েছেন। নিয়মিত শস্য উৎপাদিত হয় তাঁর বাসভবনের জমিতে। প্রতি ইঞ্চি জমির ব্যবহার তিনি করেছেন। সেখানে সোলার প্যানেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। কিন্তু সরকারি কর্মচারী এবং তার জনগণ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করছে না। তাদের কাছে ব্যাপারটি এরকম, ‘আমি নিজের পয়সা দিয়ে বিদ্যুৎ কিনে খরচ করছি, আমার পয়সা আছে আমি খরচ করব।’ কিন্তু এরা একবার ভেবে দেখছে না অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঝুঁকি। তাছাড়া দেশের ক্ষমতার বাইরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়। ইউক্রেনে রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর জার্মানি সহ ইউরোপের সকল দেশ সাশ্রয়ী হয়েছে। বিদ্যুতের খরচ কমিয়ে এনেছে।

ঢাকার আশেপাশে প্রচুর পরিমাণে শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। যার অধিকাংশই নিয়ম মেনে করা হয়নি। ব্যাটারি রি-সাইকেল শিল্পে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এই শিল্পের ক্ষেত্রে খুবই সতর্ক থাকা উচিত। কারণ সকল নিয়ম-নীতি ঠিকভাবে না মানলে এই শিল্প জলবায়ুর মারাত্মক ক্ষতি করবে এবং মানুষকে মারাত্মক রোগের ঝুঁকিতে ফেলবে।
২০২২ সালের স্টাটিস্টা ডট কমের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কয়লা এখন পর্যন্ত বিশ্বে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে তার মধ্যে কয়লা ৩৫.৬৭%, প্রাকৃতিক গ্যাস ২২.৮২%, জলবিদ্যুৎ ১৪.৯%, নিউক্লিয়ার ৯.১৫%, বায়ু ৭.৩৮%, সৌর ৪.৫৯%, অন্যান্য জীবাশ্ম ২.৯৪%, জৈবশক্তি ২.৩৪%, অন্যান্য নবায়নযোগ্য ০.৩১%।
বিশ্বে কয়লা দহন কার্বন নির্গমনের জন্য সর্বাপেক্ষা দায়ী। সবরকম বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেই কিছু না কিছু কার্বন নির্গমন হয় কিন্তু কয়লা এক্ষেত্রে বিধ্বংসী ভূমিকা পালন করে। স্টাটিস্টা এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে এক রিপোর্টে জানিয়েছে চীন বিশ্বের মোট কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫৩ শতাংশের জন্য দায়ী। কয়লা চালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে চীন এখন পর্যন্ত শীর্ষস্থানীয় দেশ। প্রতি বছর দেশটি ৫,৩০০ টেরা-ওয়াট ঘণ্টার বেশি কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এরপর আছে ভারত (১২৭৪ টেরা-ওয়াট ঘণ্টা) ও যুক্তরাষ্ট্র (৮৯৮ টেরা-ওয়াট ঘণ্টা)। দশটি বৃহত্তম কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা একসাথে বিশ্বব্যাপী মোট উৎপাদনের প্রায় ৮৯ শতাংশ উৎপন্ন করে।

২০২২ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি এবং শিল্প থেকে বিশ্বব্যাপী মোট ৩৭.১৫ বিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনিত হয়েছিল। তারমধ্যে শুধু কয়লা দহন ১৫.২২ বিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন করেছে। বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ ৮১ টেরা-ওয়াট ঘণ্টা; তারমধ্যে মাত্র ৫ টেরা-ওয়াট ঘণ্টা কয়লা বিদ্যুৎ। উভয়ক্ষেত্রে দেশটি বিশ্বে ৪৪ অবস্থানে আছে। দেশটি ৭৪,৪৭৬,২৩০ টন কার্বন নির্গমন করে বিশ্বে ৪৮তম অবস্থানে আছে। পাশাপাশি মালদ্বীপ মাত্র ০.৭ টেরা-ওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যার ০.৬ টেরা-ওয়াট ঘণ্টা আসে তেল এবং ফসিল ফুয়েল থেকে বাকিটা সৌর বিদ্যুৎ। কিন্তু বিশ্বের শিল্প উন্নত দেশগুলির আগ্রাসী অবস্থানের কারণে দেশ দু’টি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে।

বিশ্বে জলবায়ুর ঋণাত্মক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণের একটি যুদ্ধ ও অস্ত্র প্রতিযোগিতা। অপ্রয়োজনীয় এসব গোলাবারুদ ও অস্ত্রের ব্যবহার বিশ্বে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী। বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিশ্বকে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পারমানবিক পরীক্ষা শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে না, পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি করছে। যেসব এলাকায় পারমাণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়েছে, সেসব এলাকার অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে অথবা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

যুদ্ধবাজ ও ক্ষমতাশালী দেশগুলো পারমাণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা বলছে তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র নিরাপদ এবং তারা শান্তির জন্য সে কার্যক্রম চালাচ্ছে। আর তারা মনে করে ইরান বা উত্তর কোরিয়ার কাছে পারমাণবিক বোমা নিরাপদ নয়। সেক্ষেত্রে বাকি দেশগুলোর কাছে এই বোমা কেমনে নিরাপদ! ব্যাপারটি কী এরকম যে, ন্যাটো দেশগুলোর পারমানবিক বোমা ফুল বর্ষণ করবে, আর ইরান ও উত্তর কোরিয়ার বোমা শুধু ধ্বংস করবে? বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই বোমা ব্যবহারের হুমকি দিয়ে রেখেছে। বর্তমানে রাশিয়া পশ্চিমা যুদ্ধবাজ দেশগুলোকে পরিষ্কার জানিয়েছে তারা ইউক্রেনে সৈন্য পাঠালে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে। যদি তারা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে সেক্ষেত্রে শুধু ধ্বংসই ডেকে আনবে, বহু নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারাবে তাৎক্ষণিক। আর যে এলাকায় পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত হবে সেই এলাকার পরিবেশ দূষিত হবে। সেই দূষণের ভার বইতে হবে উক্ত এলাকার জনগণকে পরবর্তী অর্ধশত বছর বা তারও বেশি সময় ধরে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যে পারমানবিক বোমা ব্যবহার করেছিল, তার ভয়াবহতা ও তেজস্ক্রিয়তায় ভুগতে হয়েছে শান্তিকামী সাধারণ মানুষকে। সেখানে শিশুসহ যেসব নিরপরাধ জনগণ জীবন দিয়েছেন তাদের দোষ কি ছিল? যুদ্ধের যে পর্যায়ে সেই বোমা ব্যবহৃত হয়েছিল তখন জাপান প্রায় আত্মসমর্পণের দ্বারপ্রান্তে ছিল। সে সব বিবেচনায় বিপুল পরিমাণ নিরপরাধ জনগণকে কঠিন এক মৃত্যু ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেই সাথে বিশ্ব পরিবেশ হয়ে উঠেছিল বিষময়। যুক্তরাষ্ট্রের সে কর্ম কোন যুক্তি ও নৈতিকতায়? তার কোন বৈধ উত্তর নেই।

যা শুধু ধ্বংস করে তা কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না এবং তা বিশ্ব শান্তিতে কোন ভূমিকা রাখতে পারে না। অতএব কোন দেশের কাছেই পারমাণবিক অস্ত্র নিরাপদ নয়। শত্রু নিধনে যে দেশই সেটা ব্যবহার করুক তা শুধুই নিরপরাধ জনগোষ্ঠীর জীবন নষ্ট করবে। আর বিশ্বের জলবায়ু ও পরিবেশকে মারাত্মক হুমকির মধ্যে ঠেলে দেবে। যে অস্ত্র, সভ্যতাকে বিনাশ করে এবং শুধুই ধ্বংস বয়ে আনে তা উৎপাদনের কোন বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা বিশ্বে নেই। প্রতিটি দেশের জন্যই তা নিষিদ্ধ হতে হবে, শুধু বিশেষ কোন দেশের জন্য নয়। অন্যথায় বিশ্ব সভ্যতার ধ্বংস অনিবার্য।

বিশ্বে এ পর্যন্ত বেশ কয়েক হাজার পারমাণবিক বোমা বানানো হয়েছে। যার মধ্যে মাত্র দুটি ব্যবহৃত হয়েছে জাপানে বাকিগুলো অব্যবহৃত পড়ে আছে। যে জিনিসের ব্যবহার নেই এবং আমরা নিশ্চিতভাবেই জানি যার ব্যবহার সমস্ত বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর। কেন তা তৈরি করতে হচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে! এর উত্তর কেউ দিতে পারে না। একটি পারমাণবিক ডিভাইস বা বোমা তৈরিতে গড় ব্যয় হয় ৫ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৫০০ শয্যার অত্যাধুনিক ৬ টিরও বেশী হাসপাতাল তৈরি করা সম্ভব। যে হাসপাতালে সব রকম চিকিৎসা দেওয়া যাবে, যা মানবের কল্যাণ ক’রবে। যুক্তরাষ্ট্রের এক তৃতীয়াংশ খরচে বাংলাদেশে ওই মানের হাসপাতাল তৈরি করা সম্ভব। একটা আণবিক বোমা দিয়ে আমরা কোন ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারিনা। আণবিক বোমা কোন ভাইরাসকে ধ্বংস করতে পারে না কিন্তু অনেক মরণব্যাধি এবং ভাইরাস সৃষ্টি করে।'

করোনা কালীন সময়ে আমরা হাসপাতালের অপ্রতুলতা লক্ষ্য করেছি। এক্ষেত্রে হয়তো বলা হতে পারে স্বাভাবিক সময়ে অত হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা নেই। সেক্ষেত্রে পারমানবিক বোমার মত মারণাস্ত্রের-তো কোনদিনই কোন প্রয়োজনীয়তা ছিল না, এখনও নেই। কেন হাজার হাজার পারমানবিক বোমা উৎপাদন ক’রে অলস অর্থ লগ্নি করা হয়েছে?
একইভাবে রাসায়নিক অস্ত্র ও জীবাণু অস্ত্র মানব কল্যাণে কোন কাজে আসতে পারে না। প্রমাণ পাওয়া গেছে ইউক্রেনে আমেরিকার কিছু জীবাণু-ল্যাব ছিল। অথচ দেশটি(যুক্তরাষ্ট্র) বিভিন্ন দেশে অভিযান চালিয়েছে এসব অভিযোগে। এই জাতীয় অনৈতিক গবেষণা পরিবেশকে শুধু ধ্বংস করবে কিন্তু কোন কল্যাণ বয়ে আনবে না। রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা বিশ্বে নতুন নতুন রোগের সৃষ্টি করছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। যে দেশ বা অঞ্চল সেগুলো ব্যবহার করছে তারাও নিরাপদ থাকছে না।
বর্তমান বিশ্বে পর্যটনকে উৎসাহিত করা হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত। কিছু কিছু দেশের অর্থনীতি পর্যটন নির্ভর। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তারা পর্যটকদের মনোরঞ্জনে অবাধ সুবিধা দিচ্ছে। ভ্রমণ পিপাসীদের এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাতায়াতে বিমান, গাড়ি ও প্রমোদ-তরীর ব্যবহার হচ্ছে। এই সকল বাহনগুলো প্রচুর পরিমাণে কার্বন নির্গমন করছে, যা বিশ্বের বায়ুমণ্ডলকে বিষময় করে তুলছে। হোটেলগুলোতে খাবার ও জলের বিশাল উপচয় হচ্ছে।
এছাড়াও পর্যটকরা প্লাস্টিক ব্যাগ ও বোতল সহ বিভিন্ন জিনিস সমুদ্রে ফেলছে যা সমস্ত বিশ্বের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার ভূমধ্যসাগরীয় তিনটি দ্বীপদেশ সাইপ্রাস, মাল্টা ও রোডস আইল্যান্ড পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছিল। এই দেশগুলোও পরিবেশ দূষণে ভুগছে।
সাইপ্রাসের ক্ষেত্রে গাইড আমাদের জানালেন সেখানে আগে প্রচুর বৃষ্টিপাত হ’ত। বৃষ্টির জল তারা ধরে রাখে বাঁধের মাধ্যমে এবং শুষ্ক মৌসুমে তা ব্যবহার করে ফসলের মাঠে। ২০০৬ সালের আগে প্রচুর বৃষ্টিপাতে সকল বাঁধ উপচে পড়তো। কিন্তু এরপর আর সে রকমটি ঘটেনি। এই স্বল্প বৃষ্টি সেখানকার চাষাবাদে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। বাকি দুটো দ্বীপে চাষাবাদ হয় না বললেই চলে সেখানে গাছপালা সংখ্যাও খুব কম।
মালটায় একদিন ঘুরতে ঘুরতে প্যারাডাইস-বে গেলাম। সেখানে দেখলাম অনেকেই মাছ ধরছেন। এক বৃদ্ধ দম্পতির সাথে আলাপ হ’ল। তাদের কাছে জানতে চাইলাম মাছ কেমন পাচ্ছেন? তারা জানালেন, “দি সি ইজ এমটি। এখন আর আগের মত মাছ পাওয়া যায় না।” এসবের কারণ পরিবেশ দূষণ। সমুদ্র আর এখন মাছের অভয়ারণ্য নয়। পর্যটকরা অহেতুক যন্ত্রচালিত বাহন ব্যবহার ক’রছে অথবা তাদেরকে তা ব্যবহারে উৎসাহিত ক’রছে, সে দেশের পর্যটন ব্যবসায়ীরা। যন্ত্র-তন্ত্র স্পীড বোটগুলো মাত্রাতিরিক্ত পরিবেশ দূষণ ক’রছে। এছাড়াও হোটেলগুলো তাদের বর্জ্য সমুদ্রে ফেলছে।
মালাটায় যে হোটেলে আমি ছিলাম তারা তাদের সকল দুষিত জল সমুদ্রে ফেলছে। এই দৃশ্য আমাকে আশ্চর্যান্বিত করেছিল। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের একটি দেশের চার তারা হোটেল জনসমক্ষে পরিবেশ দূষণ করছে। অথচ এই হোটেল চার তারা সনদ পেয়েছে এবং তা বহাল আছে কেমনে! মাল্টায় কি কোন তদারকি নেই? প্রশ্নগুলো আমার সামনে এসেছিল বারবার। একটি চার তারা হোটেল সাগর দূষণ করছে কিন্তু কেউ দেখছে না ব্যবস্থাও নিচ্ছে না।
প্রয়োজনাতিরিক্ত পণ্য ও বিলাসদ্রব্য ক্রয় এবং ক্ষণে ক্ষণে মডেল পরিবর্তনও পরিবেশ দূষণ ও মাত্রাতিরিক্ত কার্বনের জন্য দায়ী। অনেক মানুষ ক্রয়াসক্ত, তারা প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কিনছে কিন্তু সেগুলো হয়তো একবার বা দুইবারের বেশি ব্যবহার করছে না। অনেক ক্ষেত্রে একবারও ব্যবহার করছে না।
অসাধু ব্যবসায়ীরা নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন ক’রে নামকরা মডেল দিয়ে বিজ্ঞাপন করিয়ে জনগণকে প্রলুব্ধ করছে। জিডিপি বাড়ানোর জন্য, নব্য ধনীর সংখ্যা বাড়ানোর জন্য সেটা হয়তো প্রয়োজন কিন্তু মানব কল্যাণের জন্য তা কি আদৌ জরুরী? প্রতিবছর জিডিপি বাড়ানোর যাঁতাকলে আমরা কার্বন উৎপাদনের মাত্রা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। জিডিপি বাড়িয়ে যে লাভ আমরা করছি সেই লভ্যাংশ দিয়ে প্রতি বছর বর্ধিত কার্বনের মাত্র কমানো সম্ভব হবে না।
আমরা শৈশবে দেখেছি একজোড়া জুতা কিনলে দীর্ঘদিন চলেছে। ছোটবেলায় আব্বা আমাকে জাফরানি রঙের এক জোড়া জুতা কিনে দিয়েছিলেন তা আমি পায়ে দিয়ে ছিঁড়তে পারিনি। এরপরও সে জুতা আমার দুই ফুপাতো ভাই পায়ে দিয়েছে তারপরও তার কিছু হয়নি। কিন্তু এখন যে সব জুতা উৎপাদন ক’রছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তার কোন কোনটি দুই সপ্তাহ ঠিকমত চলছে না। এধরণের নিম্নমানের পণ্য উৎপাদনে ভয়ঙ্কর রকমের জ্বালানি ব্যবহার করছে, যা মাত্রাতিরিক্ত কার্বন উৎপাদন ও পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী।
এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বন জঙ্গল কেটে উজাড় করে ফেলেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রথম সারির দেশগুলোর মধ্যেই থাকবে। স্বাভাবিক কারণেই উৎপাদিত কার্বন শোষণের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া লোপ পেয়ে এক ভয়ঙ্কর অবস্থায় পৌঁছেছে।
পরিবেশ রক্ষায় জার্মানি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক চামচ ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। বিকল্প হিসাবে একবার ব্যবহারযোগ্য কাঠের চামচ ব্যবহার করছে। কিন্তু একবার কি ভেবে দেখা হয়েছে এই কাঠের চামচ বানানোর জন্য কত গাছ কাটতে হবে প্রতিবছর। চামচগুলো জার্মানিতে তৈরি নয় বাইরের দেশ থেকে এসেছে। সেই সব দেশ কি নিয়ম মেনে গাছ কাটছে। আর সেখানে যদি গাছ কাটার কারণে পরিবেশ নষ্ট হয় তার প্রভাব তো জার্মানি সহ বিশ্বের সকল দেশেই পড়বে। এক্ষেত্রে প্লাস্টিক চামচ বরং ভালো যদি সেগুলো রি-সাইকেল করা হয়। সব থেকে ভালো যত সম্ভব এককালীন ব্যবহারযোগ্য জিনিসের ব্যবহার পরিহার করা। সফর-কালীন সময়ে প্রত্যেকের উচিত নিজস্ব চামচ সাথে রাখা।
আমাদের ভুললে চলবে না প্রতিটি রি-সাইকেলের ক্ষেত্রে আমাদেরকে শক্তি ব্যয় করতে হয়। এটা শুধু দৈহিক শক্তি নয় বৈদ্যুতিক শক্তি সেখানে অপরিহার্য। আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্বন নির্গমন হবে সেটাই স্বাভাবিক। সকল প্রকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেই কিছু না কিছু কার্বন উৎপাদিত হয়।
উপরে উল্লেখিত উদাহরণ ছাড়াও হাজারো উদাহরণ দেওয়া যাবে কেন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
এখনই সময় এই ভয়ংকর অচল অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার। ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, শক্তিশালী-দুর্বল, সব দেশই একটি প্রতিযোগিতায় লিপ্ত তাহ'ল যুদ্ধ এবং ধ্বংসে। প্রতিটি দেশই এখন নিত্য নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আর নতুন অস্ত্রগুলো যখন প্রদর্শিত হয় তখন উদ্ভাবক দেশের শত্রু মিত্র সকলেই আনন্দ পুলক অনুভব করে। আর তা পেতে লবিং শুরু করে।
বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞানীরা মানব কল্যাণে তাদের মেধা না খাঁটিয়ে বরং মানব সভ্যতা ধ্বংসে মেধা ব্যয় করছেন। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রতি বছর মশার কামড়ে হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। অথচ সেখানকার দু’দেশের দু’জন বিজ্ঞানী মশা নিধনের কোন সহজ উপায় বের না ক’রে বানালেন পারমানবিক বোমা। তারা দেখলেন মশা মারার কল বানিয়ে কী হবে? মশা যেহেতু মানুষকে কামড়ায়, মানব জাতিকেই উজাড় করে দিই। তখন মশা কামড়াবে কাকে? চমৎকার সমাধান।
আসলে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করলে অর্থাৎ মশা মারার কল বানালে নোবেলও পাওয়া যায় না, আর টাকা পয়সা ও নাম যশও তেমন হয় না। আর জাতীও তেমন যোশ অনুভব করে না। তাই ধ্বংসাত্মক পথই তারা বেছে নেন।
পরমাণু বিজ্ঞানী আবুল কালাম যিনি ভারতের রাষ্ট্রপতিও ছিলেন, তিনি খুব দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছিলেন। কিন্তু নিপীড়িত ও সাধারণ মানুষের কল্যাণে তিনি তার মেধাকে ব্যবহার করেননি। আসলে কামলার ছেলে যখন আমলা হয় তখন সে দ্রুত ঐ সমাজে অভিযোজিত হয় বা খাপ খাওয়ে নেয়। ভুলে যায় তার অতীত।
বাংলাদেশের নোবেল বিজয়ী এক ব্যাংকার বলেছিলেন, “গরিবিকে তিনি যাদুঘরে পাঠিয়ে দেবেন।” কিন্তু হয়েছে উল্টা। তার ব্যাংকের ঋণের প্রায় ২২% সুদ গুনতে যেয়ে অনেকে দরিদ্রতর হয়েছেন। যারা এই মোটা অংকের সুদ পরিশোধ করতে পারেনন, ওই ব্যাংকারের গুন্ডাবাহিনী তাদের ঘরের চাল থেকে শুরু ক’রে গরু ছাগল পর্যন্ত নিয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব যথেষ্ট না হ’লে তাদের বাড়ির গাছ পর্যন্ত কেটে নিয়ে সুদ উসুল ক’রেছে। আর যারা তার সুদ পরিশোধ ক’রতে পেরেছেন তাদেরকে দিনের ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছে। এরপর এসব মানুষের পরিবেশ নিয়ে ভাবার সময় থাকে না।
আমাদের ভুললে চলবে না, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মাথাপিছু আয় বাড়লেও সেখানে সাধারণ মানুষের জীবনের উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন হয়নি। সে সব স্থানে ধনীর আয় বাড়ার কারণে সকলের মাথাপিছু গড় আয় বেড়েছে। এই মারাত্মক অসম অবস্থানে বিশ্বের পরিবেশ নিয়ে ভাববার মত তাদের কোন সময় নেই থাকবে না, বিশ্ব ধ্বংস হয়ে গেলেও নয়, সেটাই বাস্তবতা।
পরিবেশ রক্ষায় একজন সৎ নেতা একটি একতাবদ্ধ দেশ ও জাতি সবথেকে কার্যকর ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে। এরকম একটি দেশের উদাহরণ আমি এখানে দিতে পারছি, দেশটি হ’ল ভুটান। মহামান্য ভুটানের চতুর্থ রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক ১৯৭২ সালে তাঁর জনগণকে ধারণা দিয়েছিলেন যে, "Gross National Happiness is more important than Gross Domestic Product." ভোগ বিলাস নয, তিনি সকল জনগণকে একত্রে সুখে শান্তিতে থাকার পথ প্রদর্শন করেছেন।
তার জাতী সে পথ অনুসরণ করেছে বিধায় সে দেশের তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী H.E. Mr. Shering Tobgay, Plenary Meeting of the United Nations Summit for Adoption of the Post-2015 Development Agenda-তে তাঁর বক্তব্যে বলতে পেরেছিলেন, “Gross National Happiness drives development in Bhutan. Our people, for example, enjoy free healthcare and free education. And our economy, even though small, is largely clean, green and renewable.
More importantly, 6 years ago, in 2009, we pledged to remain carbon neutral. But in reality, we are carbon negative. That’s because 72% of our country is under forest cover, and more than half our country is protected as national parks and wildlife sanctuaries.”
ভুটানের মানুষ সুখে আছে এবং তাদের মৌলিক অধিকারগুলো সরকার পূরণ করেছে বিধায় তারা সকলে মিলে দেশের পরিবেশ রক্ষায় শ্রম দিতে আগ্রহী হয়েছে। সবুজ বিপ্লব ও বন রক্ষায় আন্তরিক হয়েছে। কার্বনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সবুজ বিপ্লবের বিকল্প নেই। জলবায়ুর বিরূপ আচরণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এক সময় হিমালয়ের তুষার গলে ভুটান মারাত্মকভাবে বন্যা কবলিত হচ্ছিল। সেই বন্যার জলকে বাধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ক’রে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগিয়েছে। দেশটির বিদ্যুতের একমাত্র উৎস জলবিদ্যুৎ। ভুটানি জাতী সাশ্রয়ী তারা ট্রাফিক সংকেতের জন্য কোন বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহার করে না।
ভুটান যে পদক্ষেপ নিয়েছে সে অবস্থায় বাংলাদেশ কখনো যেতে পারবে না। কারণ দেশটির যথেষ্ট ভূমি নেই। সমুদ্রের জলরাশির মত সেখানে জনরাশি। দেশটির স্বাধীনতার পর যা প্রায় আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য উৎপাদনের জন্য যে জমির প্রয়োজন তার অপ্রতুলতা আছে।
এ কারণেই বন উজাড় ক’রে তারা ঘর-বাড়ি বানিয়েছে আর কৃষি কাজ শুরু করেছে। এসব জমিকে বনে রূপান্তরিত করা দুরূহ নয় প্রায় অসম্ভব। তবে দেশটির সরকার তার জনগণকে নতুন বাড়ি বানানোর অনুমতি বন্ধ করে দিয়ে বহু তল বিশিষ্ট অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের শুধু অনুমতি দিতে পারে। সেক্ষেত্রে ভূমির সাশ্রয় হবে। পতিত জমিতে বাধ্যতামূলক বনায়ন কর্মসূচি জরুরী বিশেষ ক’রে সরকারি জমিতে। আর বনায়নের অর্থ এই নয় যে গাছের বয়স ২০ বছর হলে তা কেটে ফেলতে হবে। মনে রাখতে হবে এই গাছগুলিই আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের সর্বোচ্চ সহায়ক শক্তি।
বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের ক্ষেত্রে তারা একটি গাছ লাগায় অর্থনৈতিক সমস্যার সময়ে তা বিক্রি ক’রে। কঠিন আইন এবং তার প্রয়োগ করতে হবে অননুমোদিত গাছ কাটার বিরুদ্ধে। আর সরকারী ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে যেখানেই বন আছে তা ধ্বংস বন্ধে কঠিন বিধি নিষেধ কার্যকর করতে হবে।
জলবায়ুর পরিবর্তনে বাংলাদেশ যে ঝুঁকির মধ্যে আছে। তাতে তারা যদি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ভূমি হারায়, তা শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো বিশ্বের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করবে। যে জনগোষ্ঠী ভূমি হারাবে তারা অন্য দেশে পাড়ি জমাবে যা আগেই উল্লেখ করেছি। জলবায়ুর পরিবর্তনের সমস্যা মোকাবেলায় পুরো বিশ্বকে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
চীন তার মরু অঞ্চলে সবুজায়ন করে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের অন্যান্য মরু অঞ্চলের দেশগুলোকে সে পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে অল্প কিছু মৌসুমি চাষাবাদ হচ্ছে। এটা আশাব্যঞ্জক কিন্তু পাশাপাশি বৃক্ষ রোপণও করতে হবে।
বিশ্বব্যাপী অপচয় কমিয়ে আনতে হবে। জিডিপি বৃদ্ধির নামে মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদন ও তা ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সুষম বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার পূরণ হচ্ছে না অথচ তাদের তৈরি পোশাক প’রে একজন মডেল মঞ্চে ক্যাট ওয়াক করে লক্ষ ডলার উপার্জন করছে। সেক্ষেত্রে ওই কারখানা শ্রমিকের কোন আগ্রহ বা সময় থাকবে না পরিবেশের দিকে নজর দেবার, কারণ তাকে সারাদিন শুধু খাবারের জন্যই ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা সপ্তাহে একদিনও ছুটি পায় না। ছুটি নিলে বেতন পায় না।
এক্ষেত্রে পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে হবে মডেল, অভিনেত্রী ও সেলিব্রেটিদের বেশি। অথবা তাদের উপার্জনের কমপক্ষে ৫০ ভাগ আয়কর হিসাবে কেটে নিয়ে সে অর্থ দিয়ে সরকার নিজে গাছ লাগাতে পারে। একইভাবে যে সকল কারখানার মালিক নিয়ম মানছে না তাদেরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও অধিক আয়কর ধার্য ক’রে সে অর্থ পরিবেশ রক্ষায় খরচ করতে হবে। প্রত্যেকটি শিল্পের মালিককে একেকটি কারখানার বিপরীতে ৫ হাজার গাছ লাগানো ও তা পরিচর্যা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
প্রত্যেকটি দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত পরিবেশ সচেতনতা বিষয়ক পাঠদান বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করা। একজন ছাত্র-ছাত্রী যে বিষয়েই লেখাপড়া করুক না কেন তাকে অবশ্যই পরিবেশের উপর ন্যূনতম শিক্ষা নিতে হবে স্নাতক শ্রেণী পর্যন্ত।
দিনে দিনে আমরা যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে পৌঁছেছি সেখান থেকে রাতারাতি বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। আমাদেরকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রে ন্যূনতম বনায়নের মাত্রা নির্ধারণ করে দিতে হবে শক্তভাবে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে বনায়নসহ এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় তহবিল দিতে হবে। যারা সাহায্য পাবে তাদেরকে প্রমাণ দিতে হবে যে সে অর্থ তারা বনায়নসহ পরিবেশ রক্ষার কাজে লাগিয়েছে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক কমিটিকে কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে। কারণ বাংলাদেশের ‘উড মাফিয়ারা’ ভয়ংকর, তারা বন উজাড়ে কোন কার্পণ্য করেনি অতীতে। যদি এই তহবিলের যথাযথ ব্যবহার না হয় জাতিসংঘের পক্ষ থেকে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি আমার মিউনিখে ইউএনএ ইস্টবোর্নের ভাইস চেয়ারম্যান মোজমিল হোসেনের সাথে আলাপ হ’ল। তিনি পরিবেশ নিয়ে কথা বললেন। তাকে জানালাম, আমি নিজেও ব্যাপারটিতে যথেষ্ট আগ্রহী। তিনি জানালেন, ‘ইউএনএ এর হয়ে তিনি স্বেচ্ছাসেবা দিচ্ছেন। বাংলাদেশে একাধিক প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। তার মধ্যে বন্যা নিরোধক গাছও লাগাচ্ছেন।’
সে কাজে তিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমি বিনয়ের সাথে তাকে আমার অপারগতার কথা জানিয়েছি। বলেছি, ‘আমি একজন অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল লেখক। আমার পক্ষে বিমানের টিকেট কেটে বাংলাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে গাছ লাগাতে যাওয়া মারাত্মক বিলাসিতার সামিল। চাকরির পরে যে সময় থাকে সে সময়টুকু গবেষণা ও কলাম লেখায় ব্যয় করি। মূলত আমি একজন বঙ্গবন্ধু (শেখ মুজিবুর রহমান) গবেষক। আর বিচ্ছিন্নভাবে গাছ লাগালেই হবে না। সেগুলোকে যত্ন নিতে হবে এবং বড় করে তুলতে হবে। অন্যথায় উদ্দেশ্য সফল হবে না।’
পরবর্তীতে তিনি জানতে চাইলেন, ‘আমার বাসা থেকে এয়ারপোর্ট কত দূরে, আমি কেমনে সেখানে যাতায়াত করি?’ তাকে জানালাম, “আমি পাতাল রেলে বিমানবন্দরে যাই। তাছাড়া বিগত আট নয় বছর আমি গাড়ি চালাই না; সাইকেলে কার্যালয়ে যাই। এমনকি বাজারও করি সাইকেলে। অহেতুক জামা কাপড়ের মডেল পরিবর্তন করি না। আমার ২৪/২৫ বছরের পুরনো জামা কাপড় এখনো ব্যবহার করছি।” তিনি সব হিসাব করে আমাকে জানালেন আমি কার্বন নেগেটিভ ব্যক্তি, আমার জন্য গাছ লাগানো বাধ্যতামূলক নয়। আমার জন্য সেটা বাধ্যতামূলক হলেও আমি চাইলে জার্মানির যেখানে সেখানে গাছ লাগিয়ে ফেলতে পারি না। সেখানেও নিয়ম নীতি আছে।
আমাদের বিশ্বকে সুন্দর, সুস্থ, স্বাস্থ্যকর রাখতে বৃক্ষ রোপণের বিকল্প নেই। যে পরিমাণ বনাঞ্চল একটি দেশে থাকা প্রয়োজন, সে জায়গায় উন্নীত করতে হবে। যে দেশের ভূমি কম, সেখানে জলাশয়ের ধারগুলোতে বাধ্যতামূলক বৃক্ষ রোপণ করতে হবে।
ক) যত দ্রুত সম্ভব কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করতে হবে। খ) বিলাসিতা এবং বিলাস দ্রব্য পরিহার করতে হবে। গ) ফরমেল ওয়ান এর মত পরিবেশ দূষণকারী খেলা চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে। ঘ) জ্বালানি চালিত নৌযান ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে প্রয়োজনে বন্ধ করতে হবে। বিকল্প হিসাবে প্যাডেল ও সোলার চালিত নৌযান ব্যবহার করা যেতে পারে। ঙ) আর বিশ্বের সকল মানুষকে পরিবেশ বিষয়ে শিক্ষিত ও সচেতন করে তুলতে হবে। তবেই আমরা ধীরে ধীরে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো। এক্ষেত্রে আদর্শ হিসাবে আমরা যদি ভুটানকে গ্রহণ করি, তাহলে আমাদের বিশ্বকে সুন্দরতম ও স্বাস্থ্যসম্মত ক’রে গড়ে তুলতে পারি। যেখানে মানুষ সহ সকল প্রাণী প্রাণভরে শ্বাস প্রশ্বাস নিতে পারবে।

লেখক অল ইউরোপিয়ান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন ও বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন জার্মানি- এর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক

তথ্যসূত্র সমূহঃ

statista.com/statistics
hydropower.org/factsheets/greenhouse-gas-emissions
en.wikipedia.org/wiki/List_of_countries_by_electricity_production#References
worldometers.info/co2-emissions/co2-emissions-by-country
statista.com/statistics/784682/worldwide-co2-emissions-from-coal
climate.gov
chinadaily.com.cn
www.theguardian.com/global/2024/apr/09/tenth-consecutive-monthly-heat-record-alarms-confounds-climate-scientists
www.theguardian.com/environment/2024/apr/11/worlds-coal-power-capacity-rises-despite-climate-warnings#:~:text=The%20world’s%20coal%20power%20capacity,to%20avoid%20a%20climate%20emergency.
www.theguardian.com/environment/2024/apr/15/great-barrier-reef-coral-bleaching-global-heating#:
www.nasdaq.com/articles/which-countries-are-carbon-neutral

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন