ডার্ক মোড
Thursday, 13 June 2024
ePaper   
Logo
বঙ্গবন্ধুর লেখা তথাকথিত চতুর্থ বই 'আমার কিছু কথা’ নিয়ে কিছু কথা

বঙ্গবন্ধুর লেখা তথাকথিত চতুর্থ বই 'আমার কিছু কথা’ নিয়ে কিছু কথা

মমতাজুল ফেরদৌস জোয়ার্দার

কয়েকদিন আগে একটি লেখার প্রয়োজনে ইন্টারনেটে কিছু তথ্য খুঁজছিলাম। তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের 'এক্সাম মেট' নামক গ্রুপের একটা পোস্টে চোখ পড়ল। সেখানে তারা লিখেছে, “বঙ্গবন্ধুর লেখা ৪টি বই/গ্রন্থ নিয়ে কিছু কথা।” এবং চতুর্থ বইটির ক্ষেত্রে তারা লিখেছে, “'আমার কিছু কথা' মুক্তিযুদ্ধের ওপর লিখিত বঙ্গবন্ধুর অমর গ্রন্থ।”

আমার জানামতে বঙ্গবন্ধুর লেখা বইয়ের সংখ্যা তিনটি। যা আমার সংগ্রহে আছে এবং আমি তা একাধিকবার পড়েছি। যাহোক বইটি পাবার জন্য আমার ছোট বোনকে ফোন করে দ্রুত তা যোগাড় করে দিতে বললাম। ৪/৫ দিনের মাথায় বইটি হাতে পেয়েই পড়া শুরু করলাম। বঙ্গবন্ধুর লেখা বই স্বাভাবিক কারণেই গভীর আগ্রহ সহকারে সেটা পড়ছিলাম কিন্তু কেন যেন মনোযোগ ধরে রাখতে পারছিলাম না। বানান ভুল সহ প্রচুর ভুল আমার মনোযোগ দুর্বল করে দিচ্ছিল। এমন কিছু শব্দ রয়েছে সেখানে যার সাথে আমি পরিচিত নই। আমি নিশ্চিত জানি বঙ্গবন্ধু এমন ভুল করতে পারেন না। তখনই আমার সন্দেহ হয়, এই বইয়ের লেখক বঙ্গবন্ধু নন।

আমি আবারও শুরু থেকে প্রতিটি পৃষ্ঠায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখি। তখন খেয়াল করি বইটির ভিতরের পাতায় লেখা হয়েছে, ‘(বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা বিভিন্ন নিবন্ধ ও বক্তৃতামালা)’। এরপর প্রকাশকের কথাটিও পড়ি।

সেটা নিম্নরূপ:

“কিছু কথা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জানলে বাঙালী জাতিকে জানা হয়ে যায়। এই সমস্যা জর্জরিত দেশ ও জাতিকে স্বৈরাচরী পাকিস্তান সরকারের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য তিনি বাঙালি জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে হাজির হন বার বার যার ফলশ্রুতিতে আজ আমরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক। কিন্তু নিদারুণ দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, কিছু বিপথগামী সেনাকর্তার হাতে স্বপরিবারে নিমর্মভাবে নিহত হন কিন্তু তিনি অমর রয়ে যান লক্ষ্যকেটি বাঙালির মনে আমরা এখানে বঙ্গবন্ধুর কিছু নিবন্ধ এবং উল্লেখযোগ্য বক্তৃতা একত্র করে গ্রন্থকারে প্রকাশের উদ্যোগে নিয়েছি এ ধরনের উদ্যোগ প্রথম কিনা জানিনা তবে এ কাজটি করতে পেরে আমাদের ভীষণ ভারমুক্ত মনে হচ্ছে কারণ, বঙ্গবন্ধুর জন্যে কিছু করা মানেই ঋণমুক্তি-যদিও তা সমুদ্রে এক বিন্দু বারি সম।

আমার পিতা মুক্তিযোদ্ধা কাজী মোহাম্মদ শাহজাহান বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সৈনিক ছিলেন এবং সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। যে সময় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো লেখা প্রকাশ করা দুঃসাহসের কাজ ছিল তখন আমার পিতা ভারত থেকে এক বইটি সংগ্রহ করে বাংলাদেশে প্রকাশ করেন। এটা তার ডায়েরি থেকে লেখা এবং তার নিজের লেখা এটা প্রচার করে ব্যবসায়িক সুবিধা গ্রহণ করাটা তার মূল উদ্দেশ্যে ছিল না। সে বঙ্গবন্ধুর একজন আদর্শের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বইটি প্রকাশ করেছেন। আমি তার সন্তান হিসেবে ধারাবাহিকভাবে বইটি প্রকাশ করতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করি।

আশাকরি বঙ্গবন্ধুর ভক্ত অনুসারীদের কাছে এই দুর্লভ গ্রন্থটি আদৃত হবে।

প্রকাশক”

প্রকাশকের কথায় অনেক ভুল লক্ষ করা যাচ্ছে। সেখানে দাড়ি কমাও ব্যবহার করা হয়নি অনেক স্থানে। শেষের দিকে তিনি লিখেছেন, “এটা তার ডায়েরি থেকে লেখা এবং তার নিজের লেখা এটা প্রচার করে ব্যবসায়িক সুবিধা গ্রহণ করাটা তার মূল উদ্দেশ্যে ছিল না।” আমার কাছে এটা বোধগম্য হয়নি তার ডায়েরি বলতে তিনি কাকে বুঝিয়েছেন বঙ্গবন্ধু না তার বাবাকে। আর বঙ্গবন্ধু তাঁর ডায়েরিতে ভাষণ বা এই জাতীয় বিষয় গুলো লিখে রাখতেন তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এমনকি তিনি ৭ই মার্চের মত গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের জন্যও কোন নোট রাখেননি।

প্রকাশক এরপর তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, “সে বঙ্গবন্ধুর একজন আদর্শের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বইটি প্রকাশ করেছেন।” এখানে তিনি তার বাবার প্রতি যথাযথ সম্মানটুকুও দেখাননি। ‘সে’ না লিখে ‘তিনি’ লেখা সমুচিত ছিল। অনেকই হয়তো বলবেন এটা অনিচ্ছাকৃত ভুল বা পেন মিস্টেক। কিন্তু আমি সেটা মেনে নিতে পারছি না এই কারণে যে, এই বইয়ে হাজার হাজার ভুল আছে যা গুণে শেষ করা খুব কঠিন। অতএব এত ভুলকে অনিচ্ছাকৃত বা পেন মিস্টেক বলে মেনে নেওয়া অসম্ভব।

বইটি ছাপানোর আগে প্রকাশক একবার পড়ে দেখেছেন বলে আমার বিশ্বাস হয়না। যদি তিনি পড়ে দেখতেন তাহলে এই জাতীয় ভুলগুলো হওয়ার প্রশ্নই উঠতে পারে না। একটা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়া ছাত্র/ছাত্রীও এই ভুলগুলো ধরতে পারবে।
এই বইয়ের লেখক হিসাবে বঙ্গবন্ধুর নাম দেওয়া হয়েছে প্রচ্ছদে। বইটির পঞ্চম মুদ্রণ প্রকাশ পেয়েছে একুশে বইমেলা ২০২০-এ আর ষষ্ঠ মুদ্রণে লেখা হয়েছে ‘মুজিব বর্ষ ২০২৩’। তবে প্রথম থেকে চতুর্থ মুদ্রণ কবে প্রকাশ পেয়েছিল সে সম্পর্কে কিছু উল্লেখ নেই। আর ২০২৩ সাল মুজিববর্ষ ছিল না।

বইটিতে লেখা হয়েছে প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক কাজী মোঃ শাজাহান এবং প্রকাশক কাজী শহীদুল ইসলাম শামীম। এই প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক আর প্রকাশক দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে তা আমার বোধগম্য নয়। একটি বই প্রকাশ করেন একজন প্রকাশক কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক আবার কী! একটি প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা থাকতে পারে কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক? আজকাল অনেক বইয়ের ক্ষেত্রেই দেখা যায় কারণে অকারণে অনেকের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ এরা সবাই প্রকাশকের কথানুযায়ী ‘সমুদ্রে এক বিন্দু বারি ফেলতে উদগ্রীব।’ সবাই দেখাতে ব্যস্ত যে সে বঙ্গবন্ধু সৈনিক বা তাঁর ভক্ত। কিন্তু ধোঁকাবাজি করে আর যাই হোক বঙ্গবন্ধুর ‘আদর্শ সৈনিক’ বা ‘আদর্শের সৈনিক’ হওয়া যায় না।

প্রথমত মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য জোগাড় করে, তা দিয়ে একটা বই বের করে সেখানে কোন অবস্থাতেই লেখা যায় না সে বইয়ের লেখক তিনি। বইটির উপরে কোন বিচারেই লেখক হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ করা বৈধ নয়। তাঁর নাম ব্যবহার করে পাঠক সমাজের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে ।

এই বইয়ের মধ্যে এমন কিছু বিষয় যুক্ত করা হয়েছে সেগুলো বঙ্গবন্ধু নিজে লিখেছেন সে কথাও হলফ করে বলা যাবে না। যেমন ছয় দফা তিনি প্রণয়ন করেছেন। এই দফা গুলি তার প্রণীত কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিজে হাতে বই লেখার জন্য এটা লিখেছেন তেমনটি নয়। কারণ এই দফাগুলো সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন জনের সঙ্গে আলাপ আলোচনা ও পরামর্শ করেছেন, এবং তাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছেন ছয় দফা প্রস্তুত করতে। তারপর তিনি জনসমক্ষে তা প্রকাশ করেছেন। অতএব কোন বইয়ে এগুলো সংযোজন করে বলার কোন সুযোগ নেই লেখক শেখ মুজিবুর রহমান।

প্রখ্যাত শিক্ষক ও গবেষক এম.এম. আকাশ লিখেছেন:

তাঁরা সকলেই কমবেশি বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলন, ১১ দফা আন্দোলন এবং ১৯৭০-এর নির্বাচনে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে তাত্ত্বিকভাবে, বাস্তবেও নানা সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। এ-কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা দাবির মূল অর্থনৈতিক ভাষ্য প্রথমে তাদেরই কেউ কেউ হয়তো রচনা করে দিয়েছিলেন । তাঁদেরই কেউ হয়তো বঙ্গবন্ধুর নানা র্যা ডিকাল বক্তৃতার ভাষা লিখিতভাবে তাঁকে প্রথম সরবরাহ করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর উন্নয়নদর্শন পৃষ্ঠা ৬৬-৬৭

১৯৮৯ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি রামেন্দু মজুমদার, ২৮শে অক্টোবর থেকে ১০ই জানুয়ারি, ১৯৭২ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত বিভিন্ন ভাষণ সম্বলিত “বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ” নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। বইটির প্রচ্ছদে পরিষ্কার লেখা আছে:
“বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু নির্বাচিত বক্তৃতা ও বিবৃতি

রমেন্দু মজুমদার সম্পাদিত”

বইটির সম্পাদক জনাব মজুমদার প্রতিটি বক্তব্য ও বিবৃতির ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছেন তথ্যসূত্র সমূহ। কোনটি তিনি লিখেছেন ভাষণের টেপ থেকে কোনটি পত্রিকা থেকে পেয়েছেন। সেগুলো সবই বঙ্গবন্ধুর কথা কিন্তু বইটির লেখক বঙ্গবন্ধু নন। এখানে সম্পাদক মজুমদার কোন প্রতারণার আশ্রয় নেননি তিনি সততার সঙ্গে তার কাজ করেছেন।

একইভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বান্ধবী বেবি মওদুদ মিলে ‘বাংলা আমার আমি বাংলার’ নামে একটি বই সম্পাদনা করেছেন। সেখানেও বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে কিন্তু এখানেও বলা হয়নি লেখক শেখ মুজিবুর রহমান। এক্ষেত্রেও সম্পাদক-দ্বয় সততার পরিচয় দিয়েছেন, পাঠক সমাজকে বিভ্রান্ত করেননি।

একজন লেখক যখন একটি বই লেখেন তখন তার একটা উদ্দেশ্য থাকে, সেই বইয়ের একটা শুরু থাকে, শেষ থাকে। কিন্তু যখন কোন বই বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য দিয়ে সাজানো হয় তখন সেটা সেই চরিত্র হারায়। ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে বঙ্গবন্ধুর নামে চালানো ‘আমার কিছু কথা’ বইয়ে। বইটি পড়লে খুব সহজে বোঝা যায় যে লেখক একটি বই লেখার উদ্দেশ্যে এটি লেখেননি। অর্থাৎ এটি একটি সম্পাদনা, বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য সম্বলিত। এক্ষেত্রে অবশ্যই বইয়ের প্রচ্ছদে তা উল্লেখ করা উচিৎ ছিল।

‘আমার কিছু কথা’ বইয়ের যেটি আমি প্রথম হাতে পেয়েছি সেটি প্রকাশ করেছে শিখা প্রকাশনী। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ১২৮। আমি ৬৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ার পর আর মনোযোগ ধরে রাখতে পারিনি। সবথেকে বড় কথা যে বিষয় গুলো সেখানে সংযোজন করা হয়েছে তা আমার কাছে নতুন কিছু ছিল না। তারপরও বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য একাধিকবার পাঠে সবসময়ই নতুন কিছু শিখি বা বুঝি। কিন্তু এক্ষেত্রে সমস্যা ছিল অসংখ্য বানান ভুল এবং অদ্ভুত কিছু শব্দ। ২৪ পৃষ্ঠা থেকে ৬৪ পৃষ্ঠা পর্যন্ত আমি যে ভুলগুলো চিহ্নিত করেছি তাতে গড়ে প্রতি পৃষ্ঠায় ৫/৬টি করে ভুল আছে।

এই ভুলের একটি ব্যাখ্যা আমার কাছে আছে। এক্ষেত্রে প্রকাশক বিভিন্ন পুরানো পত্রিকা বা বই থেকে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যগুলো যোগাড় করে প্রথমত স্ক্যান করেছেন, এবং পরে তা গগুল ড্রাইভ বা অন্য কোন সফট ওয়ারের মাধ্যমে ওয়ার্ড ফাইলে রূপান্তরিত করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে পুরানো পত্রিকার লেখাগুলো স্পষ্ট থাকে না, সেক্ষেত্রে শব্দগুলো ভেঙে যাওয়া সহ বিভিন্ন ত্রুটি দেখা দেয়। যেমন য়, র, ড় এইসব অক্ষর গুলোর ফোটাটি অনুপস্থিত হয়ে যায় বিভিন্ন জায়গায়। কোন কোন ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (কৃত্রিম বুদ্ধিমতা) একটা শব্দকে ভেঙে ফেলে। যেমন ‘একটি’ না লিখে ‘এ কটি বা এ-কটি’ লিখে ফেলে। আবার অনেক সময় দুটি শব্দকে একত্রিত করে ফেলে। এই ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

সফট ওয়ারের মাধ্যমে ওয়ার্ড ফাইল করার পর প্রকাশক পাণ্ডুলিপিটা একবার পড়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি। যার কারণেই এই জাতীয় অসংখ্য ভুল সেখানে রয়ে গেছে। এটা কোন ধরনের ভণ্ডামি তিনি বলছেন বঙ্গবন্ধুর জন্য কিছু করতে পারা হ’ল ঋণশোধ। এ কেমন ঋণ শোধ! প্রকাশক এখানে আসলে বঙ্গবন্ধুর প্রতি কোন ঋণ শোধ করেননি বরং তিনি মিথ্যাচার করে প্রচুর পয়সা কামিয়ে নিয়েছেন। এটাই বাস্তবতা।

মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি ঋণ শোধ করার ক্ষমতা কী কোন বাঙালির আছে? তাকে আসলে আমাদের ভালবাসা উচিত মন প্রাণ উজাড় করে। তাঁর জন্য কোন কাজ করলে, পরম ভালোবাসায় সেটা করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু এক্ষেত্রে দায়সারা একটি কাজ করা হয়েছে এবং তাঁর নাম ভাঙিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পাতা হয়েছে।

এই বইয়ের সম্পাদনাও অত্যন্ত দুর্বল বলেই অনুভূত হয়েছে। যে বক্তব্যগুলো সেখানে সংযোজিত হয়েছে তার দিন তারিখ বা স্থানের কোন উল্লেখ নেই। নির্বাচিত বক্তব্য সমষ্টিতে একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর উপর বইয়ের সম্পাদনা করতে গেলে যে বিচক্ষণতার প্রয়োজন তার ঘটতি বার বার অনুভূত হয়েছে সম্পাদকের মধ্যে।

বঙ্গবন্ধু যে সময় বক্তব্য দিয়েছেন সে সময় ‘১ মার্চ’ বলা হত না তখন তিনি(বঙ্গবন্ধু)পহেলা মার্চই বলেছেন। প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই বিষয়টিকে সম্পাদনা করা হয়েছে। যা করার কোন অধিকার বা সুযোগ কারোর নেই। এছাড়াও ৭ই মার্চের ভাষণটিকে মারাত্মক বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে প্রচুর ভুল। যারা সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ভাষণটি সম্পর্কে জানেন তারা যারপরনাই আহত ও রাগান্বিত হবেন। এখানে সম্পাদক নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে ভাষণটি উপস্থাপন করেছেন। এসব অপকর্ম ও ত্রুটির পর প্রকাশক কোনভাবেই লেখক হিসাবে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ব্যবহার করতে পারেন না। অবশ্য ত্রুটি ব্যতিরেকেও তারা লেখক হিসাবে বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করতে পারেন না।

এই বইয়ের এত ত্রুটি দেখে আমি অনলাইনে বইটি সম্বন্ধে একটু খোঁজখবর নিই। তখন দেখি, শিখা প্রকাশনী বইটি এ পর্যন্ত দুই রকম প্রচ্ছদে প্রকাশ করেছে। তারা একটা আইএসবিএন নম্বরও পেয়েছে। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে একই নামে আলাদা প্রচ্ছদে আরেকটি বইয়ের সন্ধান মিলল। সেখানে অবশ্য প্রকাশক এবং সম্পাদক ভিন্ন। কিন্তু বইয়ের তথ্য উপাত্ত হুবহু একই রকম, শুধুমাত্র এখানে দুটি অধ্যায় কম আছে, তাহল: মুক্তির লড়াই ও স্বাস্থ্য। এটি সূচীপত্রে গেলেই দেখা যাবে। এই বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৪৪। বইটি প্রকাশ করেছেন ইতিহাস প্রকাশন এবং সম্পাদনা করেছেন এম এ হাসান।

আর সব কিছুই এক ও অভিন্ন, এমনকি প্রকাশকের কথাও। প্রথম বইটির ক্ষেত্রে প্রকাশক জনাব কাজী শুধুমাত্র তার পিতা সম্পর্কে অতিরিক্ত কিছু কথা যোগ করেছেন, এই যা পার্থক্য। দুটি বই পৃথক আইএসবিএন নাম্বার পেয়েছে। তবে ইতিহাস প্রকাশন উল্লেখ করেছে বইটির কপিরাইট তাদের। আমার প্রশ্ন হল, একই তথ্য উপাত্ত সহ একই নামে দুটো বই কপিরাইট ও আইএসবিএন নাম্বার কেমন করে পেল? কপিরাইট কার্যালয় কি কোন কিছুই যাচাই করে না? তারা কোন কিছু পরখ করে না ঢালাওভাবে যদি তা বলি, সেটা ঠিক নয়। তবে ‘আমার কিছু কথা বইটির’ ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই কিছু ঘাপলা আছে।

কপিরাইট অফিস আমার লেখা বই ‘World Leaders Tribute to The Birth Centenary of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman’ বইটির কপিরাইট আটকে রেখেছে। তারা আমাকে জানিয়েছে, বঙ্গবন্ধুর উপর কিছু লিখতে হলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে ছাড়পত্র নিয়ে আসতে হবে। ট্রাস্ট বলছে এক্ষেত্রে ছাড়পত্র বাস্তবে প্রয়োজন নেই। আর সেটা তারা লিখিতও দিচ্ছে না। আর সে কারণে প্রায় দু'বছর বা তার উপরে আমার বইয়ের কপিরাইট আটকে আছে। সব থেকে বড় কথা, ট্রাস্টে যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, তাতে আমার মত একজন প্রবাসীর পক্ষে অনুমোদন পাওয়া অসম্ভব।

আমার বইটির কপিরাইট আটকে দেওয়ার প্রধান কারণ সেখানে দু'জন রাষ্ট্রদূতের মিথ্যাচার প্রমাণসহ তুলে ধরা হয়েছে। যে মহিলা আমার কপিরাইট আটকে দিয়েছে, তিনি আমার তথ্যের কোন ত্রুটি বের করতে না পেরে আমার সাথে ফোনে কথা বলতেও অপারগতা জানিয়েছেন। তিনি আমার প্রতিনিধিকে জানিয়েছিলেন, উচ্চপদস্থ দু'জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। আর আমি বইটিতে বিশ্ব নেতাদের বক্তব্যের বিশ্লেষণ করেছি। সে জন্য বঙ্গবন্ধু কল্যাণ ট্রাস্টের অনুমোদন লাগবে। আমি তৎকালীন পাকিস্তানি ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও বরিস জনসনের ভুল ধরিয়ে দিয়েছি। কপিরাইট অফিসের মহাজ্ঞানী ওই কর্মীর কাছে আমার সবিনয় জিজ্ঞাসা, ইমরান খান ও বরিস জনসন কি বাংলাদেশী বা কোনভাবে বঙ্গবন্ধু কল্যাণ ট্রাস্টের আওতাধীন যে তাদেরকে নিয়ে লিখতে গেলে আমার ট্রাস্টের অনুমতি লাগবে? আর সব থেকে বড় কথা, আমি যে তথ্য দিয়েছি সেটি ঠিক না বেঠিক, তা পরখ করে দেখা উচিৎ। যেহেতু আমার বিশ্লেষণের তথ্য ঠিক এবং এটা কোনভাবেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে না, সেক্ষেত্রে এ নিয়ে লিখলে তো কোন সমস্যা থাকার কথা নয়।

উপরিউক্ত দুই প্রধানমন্ত্রী মহান নেতা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়েছেন। সেটা আমি ধরিয়ে দিয়েছি মাত্র। এতে কপিরাইট অফিসের খুশি থাকা উচিত ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধী জামাতের চর, এসব ঘাপটিমারা দালালরা বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখালেখি হয়তো সহ্য করতে পারেনা। তাই বস্তুনিষ্ঠ বিষয়কেও তারা অনুৎসাহিত করে।

আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণামূলক লেখার জন্য যদি ট্রাস্টের অনুমতি নিতে হয়, তাহলে আমার প্রথম তিনটি বইয়ের ক্ষেত্রে তার প্রয়োজন কেন হয়নি? কপিরাইট অফিস সে উত্তর দেয় না। আমার যে বইটির কপিরাইট আটকে দেওয়া হয়েছে, সে বইটি বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বইটি বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের গ্রন্থাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে। জাদুঘর গ্রন্থাগারের পক্ষ থেকে আমাকে একটি প্রাপ্তি স্বীকার পত্রও দেওয়া হয়েছে সে মর্মে। আর আমি কোন অপকর্ম করে থাকলে আমার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা কেন নেয়া হয়নি? বর্তমান রাষ্ট্রপতি নিজ হাতে আমার প্রতিনিধির কাছ থেকে বইটি গ্রহণ করেছিলেন।

উপরের ঘটনার আলোকে নিশ্চিত করে বলা যায় যে, কপিরাইট অফিস সবকিছু দেখে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘আমার কিছু কথা’ বইটির ক্ষেত্রে দেখেও না দেখার ভান করেছে। তা নাহলে এ বইয়ের কপিরাইট এবং আইএসবিএন ক্রমিক সংখ্যা পাওয়া উচিৎ ছিল না।

অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য তার একটি লেখায় তথ্য দিয়েছিলেন, বাংলাদেশে এম.এ ডিগ্রিধারীর সংখ্যা যত, অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা তার চেয়েও কম। যে দেশে এত মানুষ এম.এ ডিগ্রি ধারী, সে দেশের কারোর চোখে কি ভুলেভরা বইটি এবং বঙ্গবন্ধুর নামে এই মিথ্যাচার চোখে পড়েনি? উপরন্তু examet মন্তব্য করেছে যে এটি মুক্তিযোদ্ধার উপর লিখিত বঙ্গবন্ধুর অমর গ্রন্থ? এ থেকে প্রমাণ হয় তারাও বইটি না পড়েই মন্তব্য করেছে অথবা এই চক্রের সাথে সম্পৃক্ত কোন না কোনভাবে। এটা কোন অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের উপর কোন বই নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধ পূর্বকালীন আন্দোলন এবং সংগ্রামের চিত্র প্রকাশ করে বইটি।

বইটির ষষ্ঠ সংস্করণ বেরিয়েছে সেক্ষেত্রে প্রচুর বই বিক্রি হয়েছে। এই বই থেকে প্রকাশক প্রচুর মুনাফা অর্জন করেছেন। রকমারি ডটকম ও প্রথমা প্রকাশনীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বইটি অনলাইনে বিক্রি করছে। আমার কাছে আশ্চর্য লাগছে যে, কেন এখনো দুই প্রকাশকের একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে কোন মামলা করেনি? একজন অন্তত অবৈধভাবে বইটি প্রকাশ করেছে। বর্তমান সময়ে এটা তাদের দুজনের অজানা থাকার কথা নয়। আমার বিশ্বাস, এদের মধ্যে নিশ্চয়ই কোন বোঝাপড়া আছে। তা নাহলে এমনটি হতে পারে না। তারা দুজনেই জানে যে কাজটি তারা করেছে তা অবৈধ। তাই তারা দুজনেই চুপ আছে।

মুক্তিযুদ্ধ-ই-আর্কাইভ ট্রাস্টও ইতিহাস প্রকাশনীর বইটি তাদের আর্কাইভে রেখেছে। তাদের তো উচিৎ ছিল বইটি পড়ে দেখে তার বৈধতা ও সম্পাদনার গুনগত মান বিচার করে বইটি প্রকাশ করা। আমার কাছে আশ্চর্য লেগেছে যে, তাদের চোখেও বঙ্গবন্ধুর নামে এই প্রতারণাটি ধরা পড়েনি।

২৫শে জানুয়ারি ১৯৭৫, বঙ্গবন্ধু বাকশালের কমিটিতে উদ্বোধনী ভাষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি দুর্নীতি ও ফটকাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন এবং তা নির্মূল করার নির্দেশনা দেন। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস, তার বক্তব্য সংগ্রহ আজ ফটকাবাজদের ব্যবসার পণ্য।

sattacademy.com, mcq.bissoy.com ও livemcqexam.com সহ বিভিন্ন ওয়েবপেজে কুইজ চালু হয়ে গেছে ‘আমার কিছু কথা’ বইয়ের লেখক কে? সেখানে সঠিক উত্তর হিসাবে লেখা হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমান। এই ভুল আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সংক্রামিত এবং প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। যেমন বাংলাদেশের বিজয়ের ঠিক প্রাক্কালে বাংলাদেশে একটি দুর্ভিক্ষ আসন্ন কি না, এ প্রসঙ্গে ইউ.এস স্টেট ডিপার্টমেন্টের অ্যালেক্স জনসন প্রথমে বলেন, তারা হবে একটি আন্তর্জাতিক বাস্কেট কেস। জবাবে কিসিঞ্জার বলেন, কিন্তু তাই বলে নিশ্চয় আমাদের 'বাস্কেট কেস' নয়।

পরবর্তীকালে ‘বাস্কেট কেস' কথাটি বিকৃতভাবে 'বটমলেস বাস্কেট' হয়ে পরিচিতি পায়। এখন বাংলাদেশের অনেক মন্ত্রীকেও বলতে শোনা যায় যে কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে বলেছিল 'বটমলেস বাস্কেট'। এমনভাবে তারা বলেন যেন সেখানে উপস্থিত থেকে তারা তা শুনেছেন। বাংলায় আমারা যাই বলি না কেন ইংলিশে 'বটমলেস বাস্কেট' ব’লে কোন শব্দ ব্যবহৃত হয় না।

জাতির জনকের নামে প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে সকল অনাচার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা আশা করব, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত এ সকল ফটকাবাজ, ভণ্ড ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন। একটি সরকারে সব রকমের লোক থাকে, সরকারি দল ও বিরোধী দলের। সেজন্য সরকারে ঘাপটি মারা দালালরা এসব ক্ষেত্রে চুপ থাকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগের উচিত এ বিষয়গুলোতে নজরদারি করা এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। আমি আশা করি, আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সেল দ্রুত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে।

লেখক, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, অল ইউরোপিয়ান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন ও বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন জার্মানি।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন