Dark Mode
Tuesday, 28 July 2026
ePaper   
Logo
বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগে পাথরঘাটায় ক্ষোভ

বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগে পাথরঘাটায় ক্ষোভ

পাথরঘাটা (বরগুনা) প্রতিনিধি

নদী ও বঙ্গোপসাগরে জেলে ও ব্যবসায়ীদের ওপর চাঁদাবাজির অভিযোগে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় ব্যাপক তোলপাড় ও জনক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে এতদিন ধরে ভুক্তভোগীদের নানা অভিযোগ ধামাচাপা পড়ে থাকলেও, সম্প্রতি এক ভিডিওতে ফাঁদে পড়ে ধরা পড়েছেন চরদুয়ানী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির এক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই)। জেলে সেজে যাওয়া কয়েকজন সাংবাদিকের কাছ থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে ঘুষ চাইতে দেখা গেছে সেই ভিডিওতে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট খবরের ভিত্তিতে কয়েকজন সাংবাদিক জেলের ছদ্মবেশ ধারণ করে চরদুয়ানী নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে যান। সেখানে কথা বলার এক পর্যায়ে সমুদ্রে মাছ ধরার অনুমতির বিনিময়ে এএসআই কবির টাকা দাবি করেন, যা গোপনে ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে ভিডিওটি হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয় সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে লুঙ্গি ও শার্ট পরিহিত এএসআই কবিরকে পা তুলে বসে ছদ্মবেশী সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার পাশাপাশি টাকা গুনতে দেখা যায়।

জেলে, ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, পাথরঘাটা একটি নদীবেষ্টিত উপজেলা, যার পূর্বে বিষখালী নদী, পশ্চিমে বলেশ্বর নদী এবং দক্ষিণে বিশাল বঙ্গোপসাগর। বলেশ্বর ও বিষখালী নদীকে যুক্ত করেছে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ 'বারানী খাল', যা একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। প্রতিদিন শত শত ফিশিং ট্রলার, স্টিল বডি ট্রলার ও ছোট ছোট নৌযান এ পথ দিয়ে যাতায়াত করে। চরদুয়ানী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে এই পথে যাতায়াতকারী ট্রলার ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ তুলে আসছেন জেলে, কাঠ ব্যবসায়ী ও ট্রলার মালিকরা।

ভুক্তভোগীরা জানান, নদী ও সাগরে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়াই করে মাছ ধরে উপকূলে ফেরার পর প্রতি ট্রিপে নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। এছাড়া দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পাথরঘাটায় অবস্থিত, যেখানে মাছ বিক্রি করে আবার সমুদ্রে যাওয়ার সময়ও চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়। নির্ধারিত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জেলেদের মিথ্যা মামলা, হয়রানি এবং বৈধ সরঞ্জাম পুড়িয়ে দেওয়া বা অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করার হুমকি দেওয়া হয়।

আজাদ ও সোহেল নামে দুই কাঠ ব্যবসায়ী জানান, গ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে তারা খাল দিয়ে খুলনা ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যান। প্রতি ট্রিপে প্রতিটি নৌযান থেকে তাদের ২,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে তাঁরা এ চাঁদাবাজির স্থায়ী অবসান দাবি করেন।

জাকির হোসেন নামের এক জেলেসহ অন্যান্যরা জানান, ছোট কাঠের নৌকা ও স্টিল বডি ট্রলার থেকে মাসে ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকা এবং মাছ ধরার ট্রলার থেকে ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা নেওয়া হয়। এছাড়া বড় নৌযানগুলোর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা ধার্য করা আছে। টাকা না দিলে মামলা, হয়রানি কিংবা জলযান জব্দের ভয় দেখানো হয়।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে অভিযুক্ত এএসআই কবিরের সাথে যোগাযোগের জন্য চরদুয়ানী নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে মুঠোফোনে জেলের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দূরে আছেন জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং পরে আর ফোন ধরেননি।

তবে চরদুয়ানী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. গাজানবী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। লেনদেনের ভিডিও ও কল রেকর্ডিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ঘটনার বিষয়ে অজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তদন্তে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।

পাথরঘাটা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা হাসিবুল হক বলেন, জেলেদের কাছ থেকে নৌ পুলিশের টাকা নেওয়ার গুঞ্জন শোনা গেলেও আগে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ভিডিওটি দেখার পর তিনি নিশ্চিত করেন যে, বিষয়টি উপজেলা সমন্বয় সভায় তুলে ধরা হবে যাতে অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী মন্তব্য করেন, দুর্নীতিবাজ নৌ পুলিশ কর্মকর্তাদের জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় নতুন কিছু নয়।

তিনি আরও বলেন, চাঁদা না দিলে জেলেদের মাছ ধরতে দেওয়া হয় না এবং চরম হয়রানির শিকার হতে হয়; রক্ষকই এখন ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। অভিযুক্ত দুর্নীতিবাজ নৌ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি শাস্তির দাবি জানান তিনি।

Comment / Reply From

You May Also Like

Vote / Poll

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলা বন্ধ করতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগ যথেষ্ট বলে মনে করেন কি?

View Results
হ্যাঁ
0%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%

Archive

Please select a date!