চট্টগ্রামে নকশাবহির্ভূত ভবনের ছড়াছড়ি: ১৫ বছরে নির্মিত ৩০ হাজার ভবনের ৯৯ শতাংশেই অনিয়ম
মো. নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম মহানগরে পরিকল্পিত নগরায়ণের চিত্র দিন দিন ম্লান হয়ে পড়ছে। গত ১৫ বছরে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) প্রায় ৩০ হাজার ভবনের নকশা অনুমোদন দিলেও এর ৯৯ শতাংশই নির্মিত হয়েছে অনুমোদিত নকশার বাইরে। সংস্থাটির নিজস্ব পর্যবেক্ষণেই উঠে এসেছে এ চিত্র। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দীর্ঘদিনের দুর্বল তদারকি, আইনের শিথিল প্রয়োগ এবং জবাবদিহির অভাবই এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সংস্থাটি ২৯ হাজার ৭০০টি ভবনের নকশা অনুমোদন দিয়েছে। এর অধিকাংশ ভবন ইতোমধ্যে নির্মাণ শেষ হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অনুমোদিত নকশা মেনে ভবন নির্মাণ হয়েছে মাত্র ১ শতাংশ। বাকি প্রায় সব ভবনেই রয়েছে কমবেশি অনিয়ম।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোথাও ভবনের সামনে, পাশে ও পেছনে বাধ্যতামূলক খোলা জায়গা (সেটব্যাক) রাখা হয়নি। কোথাও রাস্তা দখল করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। আবার ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে ১০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের ঘটনাও পাওয়া গেছে। অধিকাংশ ভবনেই রাখা হয়নি নির্ধারিত পার্কিং সুবিধা। ফলে যানজট, জলাবদ্ধতা, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, “অনেকে অনুমোদিত নকশা নিয়ে পরে বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ভবন নির্মাণ করেন। সামনে, পেছনে ও পাশে যতটুকু জায়গা রাখার কথা, তা মানা হয় না। পাহাড় কেটে, খাল-নালার ওপর ভবন নির্মাণের কারণে নগরীর পরিবেশ ও সৌন্দর্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
তিনি জানান, নগরীর ওপর চাপ কমাতে স্যাটেলাইট টাউন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ভবন নির্মাণে নকশা অনুসরণ নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি চালানো হবে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, ভবন নির্মাণে নকশা মানা হচ্ছে কি না—সেটি তদারকির দায়িত্বও তো সিডিএর। অথচ গত দেড় দশকে সেই তদারকি কার্যকরভাবে হয়নি। ফলে অনিয়ম একসময় স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য নগর পরিকল্পনাবিদদের।
নগরবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, “আইন ভেঙে যে সুবিধা পাওয়া যায়, তার চেয়ে যদি শাস্তি কম হয়, তাহলে কেউ নিয়ম মানবে না। অবৈধ ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে সিডিএকে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ কারণে অনেক সময় অভিযানও থেমে যায়। সমন্বিত নগর প্রশাসন গড়ে উঠলে আইন বাস্তবায়ন অনেক সহজ হবে।”
অনিয়ম রোধে এবার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে সিডিএ। সংস্থাটি বলছে, অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট ভবনে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ না দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, “ডিজাইন অনুমোদনের পর সেই ডিজাইন অনুযায়ীই ভবন নির্মাণ করতে হবে। ব্যত্যয় ঘটলে প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সংযোগ দেওয়া হবে না। অতীতের অনিয়ম থেকে বেরিয়ে একটি পরিকল্পিত, সবুজ ও নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।”
এদিকে, অনুমোদনহীন ও নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ বন্ধে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি কমিটিও কাজ করছে বলে জানিয়েছে সিডিএ। তবে নগরবাসীর প্রশ্ন, দীর্ঘদিনের অনিয়মের দায় কার, আর নতুন এই কঠোরতা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
Comment / Reply From
You May Also Like
Latest News
Vote / Poll
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলা বন্ধ করতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগ যথেষ্ট বলে মনে করেন কি?

