ডার্ক মোড
Saturday, 22 August 2026
ePaper   
Logo
বরিশাল বিভাগে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ২৫৯৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়

বরিশাল বিভাগে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ২৫৯৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়

নিজস্ব প্রতিবেদক 


বরিশাল বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর একটি বড় অংশে প্রধান শিক্ষক ছারাই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।
বিদ্যালয় আছে, শিক্ষার্থী আছে এবং শিক্ষকও আছেন, কিন্তু নেই প্রধান শিক্ষক।

বিভাগের মোট ৬ হাজার ২৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৫৯৯টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। অর্থাৎ প্রতি ১০টি বিদ্যালয়ের প্রায় চারটিই চলছে নেতৃত্বহীন অবস্থায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সহকারী শিক্ষকের তীব্র সংকটও। বিভাগের ছয় জেলায় সহকারী শিক্ষকের ৩ হাজার ২৯টি পদ শূন্য রয়েছে।

শুধু স্কুলেই নয়, প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থাতেও দেখা দিয়েছে বড় জনবল সংকট। ছয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৭০টি পদের মধ্যে ৩১টি এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোতে ৫৩৯টি পদের মধ্যে ৩১৩টিই শূন্য। ফলে বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান এবং প্রশাসনিক তদারকি—প্রাথমিক শিক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ তিন স্তরেই তৈরি হয়েছে স্থবিরতা।

বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষার উপপরিচালকের কার্যালয়ের দেয়া তথ্য মতে । বরিশাল জেলায় জেলার ১ হাজার ৫৮৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯৩৩টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়া।

বিভাগের অন্য পাঁচ জেলাতেও চিত্র একই রকম। পটুয়াখালীর ১ হাজার ২৩৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৯১টিতে, পিরোজপুরের ৯৮৯টির মধ্যে ৩৪০টিতে, ভোলার ১ হাজার ৪৭টির মধ্যে ৪২৮টিতে, বরগুনার ৭৯৯টির মধ্যে ৩০৬টিতে এবং ঝালকাঠির ৫৮৫টির মধ্যে ২০৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই।

প্রধান শিক্ষক বিহীন বিভাগের ৩ হাজার ৬৪৪টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন অন্য শিক্ষকেরা। তাদের মধ্যে ১ হাজার ১৪ জন রয়েছেন ‘চলতি দায়িত্বে’। স্থায়ী প্রধান শিক্ষকের বদলে বছরের পর বছর ধরে অস্থায়ী ব্যবস্থা দিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে।

প্রধান শিক্ষক শুধু একটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধান নন; শিক্ষকরা নিয়মিত আসছেন কি না, পাঠদান ঠিকভাবে হচ্ছে কি না, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি কেমন এবং বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বজায় থাকছে কি না—এসবের মূল তদারককারী তিনি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এই পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক কার্যক্রম মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহকারী শিক্ষকের সংকট। ছয় জেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৩৩ হাজার ১২৩টি। বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩০ হাজার ৯৪ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৩ হাজার ২৯টি পদ। এর মধ্যে বরিশালে ৬২৯টি, পটুয়াখালীতে ৭৭৫টি, পিরোজপুরে ৪৯৬টি, ভোলায় ৪৬৪টি, বরগুনায় ৩৮০টি এবং ঝালকাঠিতে ২৮৫টি পদ খালি।

অর্থাৎ কোথাও প্রধান শিক্ষক নেই, কোথাও সহকারী শিক্ষক কম, আবার কোথাও দুটি সংকটই একসঙ্গে বিদ্যমান। এতে কর্মরত শিক্ষকদের ওপর কাজের চাপ বাড়ছে। ফলে শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, নিয়মিত পাঠদান এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বাড়তি যত্ন নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন বলেন, ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে। ২০১৭ সালে কিছু জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাদের স্থায়ী পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে অনেকেই অবসরে গেছেন বা মারা গেছেন, কিন্তু নতুন করে পদোন্নতির কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

স্কুলের বাইরে তদারকি সংস্থাতেও জনবল সংকট প্রকট। বিভাগের ছয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৭০টি পদের বিপরীতে মাত্র ৩৯ জন কর্মরত, শূন্য ৩১টি পদ। উপজেলা শিক্ষা অফিসগুলোতে ৫৩৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২২৬ জন, অর্থাৎ ৩১৩টি পদই ফাঁকা। এমনকি বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয়েও ১৪টি পদের মধ্যে ৫টি পদ খালি রয়েছে।

সচেতন মহলের মতে, যাদের ওপর তদারকির দায়িত্ব, তাদেরই যদি বড় অংশ অনুপস্থিত থাকে, তবে বিদ্যালয় পরিদর্শনের কার্যকারিতা ও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর মো. জাহিদুল কবির তুহিন জানান, পুরো বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন