
প্রধান উপদেষ্টা নিজেই শুল্ক নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন: শেখ বশির
স্টাফ রিপোর্টার
উচ্চ শুল্কের চাপ থেকে রেহাই পেতে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন আহমেদ।
মার্কিন শুল্ক নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার জরুরি বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তের বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি (মুহাম্মদ ইউনূস) যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন।
একই সঙ্গে সামষ্টিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ‘যা ভালো’ সেগুলো সমন্বয় করে আমদানি করার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
নিবার সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হওয়া প্রায় দুই ঘণ্টার বৈঠকের পর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে ব্রিফিংয়ে আসেন বাণিজ্য উপদেষ্টা।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ''আমরা বাণিজ্য ঘাটতি কমাব। সেটার জন্য একটা রাস্তা হচ্ছে আমদানি বৃদ্ধি। আমাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যই আমরা আমদানি বৃদ্ধি করব।''
শুল্ক পরবর্তী করণীয় বোঝার চেষ্টার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের বিপরীতে বাংলাদেশের জন্য কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কি না সেটিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে তুলে ধরেন তিনি।
শেখ বশির বলেন, ''আমাদের প্রধান উপদেষ্টা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। যেহেতু আমাদের নিশ্চিতভাবে সবচাইতে বড় সম্পদ প্রধান উপদেষ্টা মহোদয়। উনার যে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা সেটাকে আমরা ব্যবহার করে আমরা যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সাথে আমরা যোগাযোগ করব।''
বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসানোর প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এ জরুরি বৈঠক ডাকেন। এতে সরকারের উপদেষ্টা, সরকারি কর্মকর্তারাসহ অর্থনীতিবিদরা অংশ নেন।
প্রায় দুই ঘণ্টার বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা ফেব্রুয়ারিতে প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের তথ্য তুলে ধরে বলেন, তিনি মার্কিন শুল্ক বিভাগের সঙ্গে আলোচনায় বসে বাণিজ্য বাড়ানো নিয়ে আলোচনা করেন।
”আমাদের আগ্রহ যে বাণিজ্য বৃদ্ধি কল্পে আমাদের কর্মসমষ্টি নির্দিষ্ট করেন। এবং তার পরিপ্রেক্ষিতেই আজকে যে আমেরিকা থেকে যে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে দুনিয়াব্যাপী, একটা বেজলাইন ট্যারিফ দেওয়া হয়েছে ১০ পার্সেন্ট এবং এর সাথে দেশভিত্তিক বাণিজ্যের যে ঘাটতি, এই ঘাটতির উপরে একটা হিসাব করে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রূপে শুল্ক আরোপ করেছে। আমাদের উপরে আরোপিত শুল্ক এবং আমাদের বাণিজ্যের যে ধরণ এবং বাণিজ্যের যে গঠন, এটার উপর ভিত্তি করে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনায় এবং প্রধান উপদেষ্টা নিজেই যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে সংযুক্ত হবেন এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান তুলে ধরার জন্য।”
বাংলাদেশের সম্ভাবনার বিষয়টি তুলে ধরতে গিয়ে শেখ বশির বলেন, “সম্ভাবনার বিপরীত যে বিষয়গুলো রয়েছে, আমরা সে বিষয়গুলোকে সাম্যকভাবে উপলব্ধি করে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে এনে আশা করছি যে তুলনামূলকভাবে আমরা আমাদের প্রতিযোগী দেশের থেকে ভালো অবস্থানে যাওয়ার প্রচেষ্টায় রত আছি।’’
দুই পক্ষের স্বার্থ ঠিক রেখে কীভাবে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ''আমদানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যেতে পারে। সয়াবিন তেল, পোশাক শিল্পের জন্য তুলা, মেটাল স্ক্র্যাপ আমদানি করি যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এছাড়া শিল্প যন্ত্রাংশ, জ্বালানি পণ্য আমদানি করি। জ্বালানি পণ্য আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে করি। সামষ্টিকভাবে আমাদের অর্থনীতির জন্য যা ভালো সেগুলো সমন্বয় করে আমদানি করব।''
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেনটেটিভ খলিলুর রহমান, বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী ও মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন মিয়া, এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান, বিডার নির্বাহী আশিক চৌধুরী, অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের শতাধিক দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় ৩৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্কের মুখোমুখি হবে।
এতদিন বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ, যা এখন বেড়ে হল মোট ৫২ শতাংশ।
বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৪০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যার মধ্যে তৈরি পোশাকের পারিমাণ ৭৩৪ কোটি ডলার।
নতুন করে সম্পূরক শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বড় ধাক্কা খেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের এ নিয়ে আতঙ্কের বিষয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ''আমাদের ধারণা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হব না। কারণ আমাদের প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, চীন, কম্বোডিয়ার শুল্ক বেশি। আমাদের চেয়ে কম শুল্ক ভারত ও পাকিস্তানের থাকলেও আমাদের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য তাদের থেকে অনেক বেশি বহুমুখী। আমাদের শিল্পের যে অবয়ব দেশ দুটো থেকে অনেক বেশি পরিপক্ষ। তাই আমরা মনে এটি আরও সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।''
শুল্ক নিয়ে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। বাংলাদেশের পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ''গত ফেব্রুয়ারি থেকে প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেনটেটিভ যোগাযোগ শুরু করেছেন। আমরা তাদের সঙ্গে শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়, চাই বাণিজ্য বৃদ্ধি করতে। সে জন্য করণীয় ঠিক করতে বিভিন্ন কার্যক্রমের পাশাপাশি তুলা আমদানির জন্য আমদানি নীতি সংশোধন করেছি।''
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি পণ্যে আরোপিত শুল্ক ৩ শতাংশের কম থাকার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন,৭৪ শতাংশ আমদানি শুল্কের তথ্যটা সঠিক নয়।
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, ''ইউএসটিআর প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশে তিনটা বিষয় উল্লেখ করে— কাস্টম অ্যান্ড ডিউটি; ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি এনফোরসমেন্ট; সহজে ব্যবসা পদ্ধতি। আমাদের সংস্কার এজেন্ডার সঙ্গে এগুলো মিলে যায়। তাই আমরা তাদের কাছে যে বার্তাটা নিয়ে যাচ্ছি সেখানে বিষয়টি উল্লেখ থাকবে।''
আরেক প্রশ্নের জবাবে শেখ বশির বলেন, ''বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাদের যে তিনটা মূল্যায়ন সেগুলো আমাদের সংস্কারের কাজের সাথে একত্রিত হয়েছে। আমাদেরও উদ্দেশ্য এবং তাদের আকাঙ্ক্ষাগুলোকে সমন্বয় করলে বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা মনে করি।''
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস অবশ্য এরই মধ্যে বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধানে ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ হবে বলে তিনি আশাবাদী।
জরুরি এ বৈঠক শুরুর আগে সন্ধ্যায় যমুনার গেটে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কারণে আশার কথা শোনান। বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়বে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নির্দেশে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান শনিবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরাও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ব্যবসায়ীরা যেসব সুপারশ দিয়েছেন তা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।