মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক স্থবিরতা ও অনিয়ম: দায় কি শুধুই জেলা প্রশাসকদের?
বিশেষ প্রতিনিধি
মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক তদারকি, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ভূমিকা সবসময়ই কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মাঠপ্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে গতিহীনতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর প্রথাগতভাবেই আলোচনার তির বিদ্ধ করছে জেলা প্রশাসকদের।
এমন পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে একটি জোরালো প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—মাঠপর্যায়ের সকল ব্যর্থতা ও অনিয়মের দায় কি এককভাবে ডিসিদের, নাকি বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোর গভীরে জড়িয়ে থাকা অন্যান্য অংশীদারদেরও এতে বড় ভূমিকা রয়েছে?
অভিযোগের তির কেন ডিসিদের দিকে ? :
প্রশাসনিক কাঠামোর ধরণ অনুযায়ী জেলা পর্যায়ে ডিসিরাই সরকারের মূল প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। রাজস্ব আদায় থেকে শুরু করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নির্বাচন পরিচালনা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় কার্যক্রমের সমন্বয়—সবকিছুর মূল চাবিকাঠি থাকে তাঁদের হাতে। ফলে মাঠপর্যায়ে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে কিংবা নাগরিক সেবা পেতে ভোগান্তি বাড়লে প্রথম আঙুলটি ওঠে জেলার এই শীর্ষ কর্মকর্তার দিকেই।
জেলা প্রশাসকদের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিসিরা একটি বিশাল কাঠামোর মধ্যমণি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁরা স্বাধীনভাবে সব সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। মাঠপর্যায়ে তাঁদের কাজের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বড় বাধা ও সীমাবদ্ধতা কাজ করে।
ঊর্ধ্বতন আমলাতন্ত্র ও নীতিগত জটিলতা:
কেন্দ্র থেকে আসা নীতি ও নির্দেশনার বাইরে গিয়ে মাঠপর্যায়ে তাৎক্ষণিক স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বেশ সীমিত। অনেক সময় কেন্দ্র থেকে বিলম্বিত বা অস্পষ্ট নির্দেশনা আসার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে কাজের স্থবিরতা তৈরি হয়।
বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সাথে সমন্বয়হীনতা:
জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য, প্রকৌশল, কৃষি বা শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোর নিজস্ব কর্মকর্তা রয়েছেন। কাগজে-কলমে ডিসি সমন্বয়কের ভূমিকায় থাকলেও এসব দপ্তরের নিজস্ব চেইন অব কমান্ড বজায় থাকে, যা অনেক সময় মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করে।
স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের চাপ:
মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকে। প্রায়শই নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে স্থানীয় চাপ সামলাতে হয় আমলাদের।
দায় কাঠামোর অন্যান্য অংশীদারদেরও
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে দায় ভাগ করে দেখতে হবে। শুধু একজন ব্যক্তির ওপর সমস্ত দায় চাপিয়ে মূল সমস্যা আড়াল করার চেষ্টা চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।
১. মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় তদারকি: মাঠপর্যায়ের স্থবিরতার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর দুর্বল নজরদারি এবং পরিকল্পনা প্রণয়নের ত্রুটিও অনেকাংশে দায়ী।
২. স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা: উন্নয়ন প্রকল্পের সঠিক তদারকি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার দায়িত্ব স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও। তাঁরা নিষ্ক্রিয় থাকলে বা ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য দিলে সার্বিক কাজ ব্যাহত হয়।
৩. বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা:
জেলা প্রশাসকের একক ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে অন্যান্য কারিগরি ও বিশেষায়িত বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সমাধান কোন পথে? :
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একক কোনো পদের ওপর দায় চাপিয়ে মাঠপ্রশাসনের অনিয়ম ও স্থবিরতা দূর করা সম্ভব নয়।
প্রয়োজন আমূল কাঠামোগত পরিবর্তন:
"মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত সুশাসন ও গতিশীলতা ফেরাতে হলে এককভাবে কাউকে বলির পাঁঠা না বানিয়ে পুরো ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। কাজের স্বচ্ছতা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে ডিসি পরিবর্তন করেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাবে না।"
চূড়ান্ত বিশ্লেষণে বলা যায়, মাঠপর্যায়ের অনিয়ম ও ব্যর্থতার দায় নিঃসন্দেহে জেলা প্রশাসকদের ওপরও বর্তায়, তবে তারা এককভাবে দায়ী নন। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হলে কেন্দ্র থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত গোটা ব্যবস্থার সমান্তরাল জবাবদিহিতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
তাছাড়া, জেলা প্রশাসকদের মতো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এভাবে ব্যবস্থা নিলে পরবর্তীতে কোন সরকারি কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা দেখাবেন না এবং এবং উৎসাহ হারাবেন ফলে প্রশাসনে স্থবিরতা নেমে আসতে পারে।
অন্যদিকে, নির্দিষ্ট কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তা যাচাই না করে সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আইন সঙ্গত নয়।

