বাউফলে কৃষিজমি কেটে তিন চুল্লি, কালো ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত জনজীবন
বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বগা ইউনিয়নের চাবুয়া সড়কের পাশে নদী ও কৃষিজমি থেকে মাটি কেটে বিশাল স্তূপ তৈরির অভিযোগ উঠেছে। একই এলাকায় বসানো হয়েছে তিনটি চুল্লি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব চুল্লিতে কাঠ জ্বালিয়ে পাথর পোড়ানো হচ্ছে। চুল্লি চালু হলেই বের হচ্ছে ঘন কালো ধোঁয়া। সেই ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের বসতবাড়ি, সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে চাবুয়া সড়কের পাশে গিয়ে দেখা যায়, চুল্লিগুলোর চারপাশে মাটির বড় বড় স্তূপ। কোথাও জমি কেটে নিচু করা হয়েছে, আবার কোথাও কাটা মাটি স্তূপ করে তৈরি করা হয়েছে উঁচু ঢিবি। চুল্লির পাশে বিপুল পরিমাণ কাঠ মজুত থাকতে দেখা যায়। চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চুল্লিগুলো চালু থাকলেও কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। ধোঁয়া ও পোড়া গন্ধে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কয়েকজন বাসিন্দা চোখ-মুখে জ্বালাপোড়া, চুলকানি, অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্টের সমস্যার কথাও জানিয়েছেন।
তবে এসব স্বাস্থ্যগত সমস্যার সঙ্গে চুল্লির ধোঁয়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে পরিবেশগত বায়ুমান পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যগত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
চুল্লিগুলোর আশপাশে রয়েছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বাসরাবাদ চাবুয়া সালিয়া আলিম মাদ্রাসা, সাবুয়া দ্বীনিয়া মাদ্রাসা, চাবুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কায়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দাওরাভাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বানাজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বামনিকাঠি কেসিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বামনিকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
প্রতিদিন এসব প্রতিষ্ঠানে শত শত শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। ফলে চুল্লির ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “চুল্লি জ্বললে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করেও ধোঁয়া থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। শিশুদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় আছি।”
চুল্লিগুলোর পরিবেশগত অনুমোদন রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পরিবেশগত ছাড়পত্রের কপি বা অনুমোদনের নথি পাওয়া যায়নি।
তবে কারখানার মালিক ইকবাল মাহমুদ দাবি করেছেন, পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
এখানেই উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করা এবং ছাড়পত্র পাওয়া কি একই বিষয়?
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই করলেই এ প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি আদৌ পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছে কি না, পেলে কোন শ্রেণিতে পেয়েছে এবং কী কী শর্ত দেওয়া হয়েছে—এসব বিষয় এখন যাচাইয়ের অপেক্ষায়।
চুল্লির পাশে থাকা বিপুল মাটির স্তূপ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, নদী ও নদীসংলগ্ন এলাকা এবং কৃষিজমি থেকে মাটি কেটে এসব স্তূপ তৈরি করা হয়েছে।
তবে মাটি ঠিক কোন স্থান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, কত পরিমাণ মাটি কাটা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট জমির মালিকের অনুমতি রয়েছে কি না কিংবা সরকারি কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মাটি কাটার সময় ওই এলাকায় গাছপালাও কেটে ফেলা হয়েছে। ফলে কৃষিজমি ও নদীতীরের ভূমির পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
চুল্লির পাশেই দেখা গেছে বিপুল পরিমাণ কাঠ। স্থানীয়দের দাবি, এসব কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে চুল্লি চালানো হচ্ছে।
তবে কাঠগুলো কী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, প্রতিদিন কী পরিমাণ কাঠ পোড়ানো হয় এবং কাঠের উৎস কী—এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন ও যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
বগা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বাবুল মৃধা বলেন, এলাকায় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য শিল্পকারখানা প্রয়োজন। তবে তা পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি করে পরিচালনা করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, “শিল্পকারখানা হোক, মানুষের কর্মসংস্থান হোক। কিন্তু এর জন্য নদী, কৃষিজমি ও পরিবেশ ধ্বংস করা যাবে না।”
বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবদুর রউফ বলেন, কালো ধোঁয়ার কারণে বাতাসের মান খারাপ হলে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় থাকা ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় দূষিত বাতাসে থাকলে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা তৈরি বা বেড়ে যেতে পারে।
তবে বগার চুল্লিগুলোর কারণে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো রোগ বা স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা বেড়েছে, তা জানতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরিবেশগত বায়ুমান পরীক্ষা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিষয়টি নিয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। অনুমোদন না থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পটুয়াখালী জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক লোভানা জামিল বলেন, বিষয়টি তাঁর নজরে নেই। সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করবেন।
চাবুয়ার এ স্থাপনাকে ঘিরে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—নদী ও কৃষিজমি থেকে মাটি কাটা হয়েছে কি না, মাটি কাটার অনুমোদন আছে কি না, গাছপালা কাটার ঘটনা ঘটেছে কি না, তিনটি চুল্লি পরিচালনার বৈধতা কী, পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়া গেছে কি না এবং কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে কি না।
এর পাশাপাশি জনবসতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এত কাছে চুল্লিগুলোর অবস্থান পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শুধু মালিকপক্ষের কাগজপত্র যাচাই নয়, প্রয়োজন সরেজমিন তদন্ত, পরিবেশগত বায়ুমান পরীক্ষা, মাটি কাটার উৎস যাচাই এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের নথি পরীক্ষা।
প্রশাসন ইতোমধ্যে কাগজপত্র চেয়েছে। এখন মাঠপর্যায়ের তদন্ত ও নথিপত্র যাচাইয়ে প্রকৃত চিত্র কী উঠে আসে, সেটিই দেখার বিষয়।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি যেন শুধু নোটিশ ও আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। নদী, কৃষিজমি, গাছপালা, পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি বৈধ শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগও নিশ্চিত করা হোক।
তাঁদের কথা স্পষ্ট—শিল্প চাই, কর্মসংস্থান চাই; তবে উন্নয়নের নামে নদী, কৃষিজমি ও মানুষের স্বাস্থ্য বিসর্জন দিয়ে নয়।
মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন
আপনি ও পছন্দ করতে পারেন
সর্বশেষ
জনপ্রিয়
আর্কাইভ!
অনুগ্রহ করে একটি তারিখ নির্বাচন করুন!
দাখিল করুন

