ডার্ক মোড
Monday, 22 June 2026
ePaper   
Logo
ঢাবি কী তার চিরচেনা রুপ হারিয়ে ফেলছে

ঢাবি কী তার চিরচেনা রুপ হারিয়ে ফেলছে

মালেকা আক্তার চৌধুরী

বিষন্ন পৃথিবীর বৈরি সময়। চারদিকে মৃত্যু র মিছিল। মন ভালো নেই কারও। আরও কতো কতো অজানা অদৃশ্য কারণে মন অহরহরই বিষাদের অলিগলিতে অস্পষ্ট আলোয় হোঁচট খেয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর নিত্য প্রয়াসে ছুটে চলে। সময় যেনো নিজের নিয়মেই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে চলেছে অজানা কোনো ঐশ্বরিক আহ্বানে। তবুও জীবন জীবনের নিয়মেই এগিয়ে চলে। ব্যত্যয় নেই কোথাও। প্রজন্মের ইতিহাস পুনরাবৃত্তির ইতিহাস। তবুও আমরা ইতিহাসের শিক্ষাকে এড়িয়ে চলি, মানতে চাই না।

সময়ের নিয়ম মেনেই পুত্রবধূ ঘর আলোকিত করেছে। ওর নরম পায়ের আলতো ছোঁয়ায় নুপুরের ছন্দ তোলে। বড় আদর লাগে। দুষ্টু মেয়েটা খুনসুটিতে ভরিয়ে রাখে পারিবারিক আবহকে। ওর কোনো আবেগি আবদারকে না বলার দুঃসাহস আমার নেই। শরীর মন যত খারাপই থাকুক না কেনো। যে কোনো কারণে হঠাৎ মন খারাপ হলেই instant decision, মাকে নিয়ে এখনই বাইরে যেতে হবে। সেদিন শুক্রবারেও এমনটি ঘটেছিলো। বাসার সবাইকে নিতে হবে সাথে, নইলে মন ভারী খারাপ তার। সেদিন ঘুরে এসেছি সেই প্রিয় চিরচেনা, প্রাণের মোহনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন। এদিক সেদিক করে বড় পুত্রের বাইকে করে ফিরেছি রাত পৌনে তিনটায়।

গেলো শুক্রবারেও মুক্তি মেলেনি। এবার বাহানা নীলক্ষেতে বই কিনবো, কীসব পানিপুরি, ভেলপুরি খাবো, তারপর ফিরবো। না বাইকে নয়। রিকশা করেই ঘুরে বেড়াবে। অগত্যা গোধূলি সাঝের শেষ বিকেলে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের ঝিরিঝিরি মিষ্টি হাওয়ায় রিকশা করেই যেতে যেতে থামতে হলো টি এসসির কাছাকাছি এসে। বাঁশের ব্যারিকেড। এবার হেঁটে হেঁটে যেতে হবে নীলক্ষেত। কিন্তু আরেক দফা মন খারাপ হলো। বাঁশের ব্যারিকেড যেনো বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো। চারদিকে লোকে লোকারণ্য। মেলার মতো যত্রতত্র বাহারি খাবার দাবার খেলনা, মায়ের কোলে ছোট্ট শিশুর অঝোর কান্না ; চারদিকে শব্দদূষণের মাত্রা ছাড়িয়ে ফ্লাড লাইটের আলোতেও শুষ্ক ধূলির কণা উড়ে উড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। রয়েছে বৃহন্নলাদের আইসক্রিম - পান খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে দাপুটে বিরক্তিকর অত্যাচার। মনে হলো ঢাবি তার চিরচেনা চিরতারুণ্য হারিয়ে সর্বস্তরের সর্ববয়সীদের এক বিনোদন কেন্দ্রের তথা পর্যটনের তীর্থস্হানে পরিণত হয়েছে। বন্ধ গেইট কলরবমুখর রোকেয়া হলের, টিএসসির প্রবেশদ্বার, কলাভবনের মুল ফটক, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সদর দরজা এমনকি আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটেও নেই ঝলমলে আলোর তীব্রতা।

যে মেধাবী মুখগুলো খুঁজে ফিরেছি বলা চলে তার ছিঁটেফোঁটারও সন্ধান মেলেনি। আবার কবে সেই মুখর হাকিম চত্বর, চারপাশের আবহে ছাত্র ছাত্রীদের আড্ডাবাজি, দিনশেষে চায়ের পেয়ালায় শিক্ষা, সংস্কৃতি কিংবা রাজনীতির ঝড় উঠবে? রাজপথ জুড়ে সারি সারি চেয়ার থাকবে রাজু ভাস্কর্যের সামনে অথবা ডাচ ক্যাফেটেরিয়া চত্বরে ; মঞ্চে মাইকে চলবে শিক্ষার্থীদের আবৃত্তি, গান, নৃত্য অথবা ছাত্র নেতৃবৃন্দের আদর্শিক ভাষণ, বক্তৃতা। অথবা বিশাল মলচত্বরে চলবে দেশের নামকরা কৃতি সংগীতশিল্পীদের আয়োজনে ঢাম ঢাম শব্দের তালে তালে কনসার্ট। বড় অসহায় লাগলো নিজেকেও। তবুও যাযাবরের দৃষ্টিপাত থেকে আবারও উল্টোকরে বলতে চাই, সমানভাবে চাই গতির আনন্দ আর যতির আয়েস।

বাচ্চাদের পাল্লায় পড়ে গায়ে ঢাবিয়ানের গন্ধ মেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পানিপুরি আর চিড়া ভাজা খেলাম। অনিক ( বড় পুত্র), অর্নব ( ছোটো পুত্র) ছবি তুলে যাচ্ছিলো। অবশেষে কন্যাও ক্লিক ক্লিকে হাত লাগালো। অবশ্য আর একটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের একটি টহল গাড়ির সন্ধানও মিলেছিলো। তবে অলস দাঁড়িয়ে।

যাহোক, বড় পুত্র আর্জেন্টিনা - ব্রাজিলের খেলায় ( বিজয়ী আর্জেন্টিনার জন্য) কন্যা বৌমার সাথে পূর্ব প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী ট্রিট দেবে বলে আমাদের সবাইকে ধানমন্ডির সুলতান' স ডাইনে নিয়ে চললো ঐতিহ্যবাহী রিকশা রাইডে। মন থেকে কষ্টটাকে উপড়ে ফেলতে পারছিলাম না। একটা অস্বস্তিও তাড়া করে ফিরছিলো বার বার। কভিডের রাজ্যে পৃথিবীকে ছন্দহীন এলোপাথাড়ি গদ্যময় বলেই মনে হলো।

অবশেষে সুলতান' স ডাইন থেকে আমাদের নতুন ছোট্ট বাসা ( এখনও প্রক্রিয়াধীন) জিগাতলায় কন্যা বৌমাকে ঘুরিয়ে এডভোকেট সৈয়দ বেলায়েত ভাইয়ের বাসায় ভাবীর অতিযত্নে আবারও আন্তরিক আপ্যায়নে সিক্ত হয়ে যখন বাসায় পৌঁছালাম ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ঠিক একটা।

পরদিন ছোটো পুত্র আর পুত্রবধূ কভিড টিকার দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে, এখন দুজনই আবার টিকা জ্বরে বিছানাও নিয়েছে। তাই বিনীতভাবে দোয়ার দরখাস্ত রইলো ওদের জন্য।

বিঃ দ্রঃ সাকিবমনিকে ( বৌমার ছোটো ভাই) অনেক ধন্যবাদ আমাদের আনন্দ আয়োজনে অংশগ্রহণ করে ভালোলাগার মাত্রাটাকে বাড়িয়ে দেবার জন্যে। আরেক পিচ্চি সোনা আবিদ যে কিনা আমার ফোন পেলেই বুঝে ফেলে এটা অনন্যা আপুর আম্মু। সেই আবিদ আব্বুর জন্যও রইলো অনেক অনেক আদর।

লেখক অধ্যাপক দর্শন বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা।

ঢাবি কী তার চিরচেনা রুপ হারিয়ে ফেলছে
ঢাবি কী তার চিরচেনা রুপ হারিয়ে ফেলছে

ঢাবি কী তার চিরচেনা রুপ হারিয়ে ফেলছে

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন