কলাপাড়ায় দুর্নীতি-অনিয়মে সেরা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিদা
গোফরান পলাশ, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
মাসের বেশিরভাগ দিনেই অফিস করেন না তিনি। অফিসে একদিন এসে স্বাক্ষর করেন সপ্তাহের পুরো হাজিরা খাতায়। কেউই বলার নেই তার বিরুদ্ধে। এতে দিন দিন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন তিনি। এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে কলাপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিদা বেগমের বিরুদ্ধে।
সূত্র জানায়, নিয়ম বহির্ভূত ভাবে শিক্ষকদের ডেপুটেশন বদলী থেকে ৩০-৫০ হাজার করে নেন তিনি। এছাড়া শিক্ষকদের পিআরএল, এলপিআর, শ্রান্তি বিনোদন, লাম গ্র্যান্ড, মাতৃত্বকালীন ছুটি, ঋণ আবেদন, টিএ বিল, এমনকি পেনশন সব কিছুতেই টাকা দিতে হয় অফিসকে। অফিস কন্টিজেন্সির কম্পিউটার মেরামত, কালি, কাগজ-কলমের জন্য বরাদ্দকৃত ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পুরোটাই তার পেটে। স্কুল প্রতি ইন্টারনেট, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা, গোল্ড কাপ, কন্টিজেন্সি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংস্কার ও উন্নয়নের সরকারী বরাদ্দ ক্ষুদ্র মেরামত ও স্লিপ প্রকল্প থেকেও পারসেন্টেজ দিতে হয় তাকে। ইমারজেন্সি ইন এডুকেশন খাতের ৫টি বিদ্যালয়ের ৩ লক্ষ হারে বরাদ্দকৃত টাকা থেকে ৫ পারসেন্ট নেন তিনি। ৩২ টি স্কুলের নির্বাচনী কেন্দ্র সংস্কার বরাদ্দ থেকেও ৫ হাজার টাকা করে নেন তিনি। প্রাথমিকের ১১৯৪ বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার প্রবেশ পত্রের জন্য নিয়ম বহির্ভূত ভাবে ১০ টাকা করে আদায় করে ১১, ৯৪০ টাকার পুরোটাই নেন তিনি।
সূত্রটি আরও জানায়, উপজেলার পূর্ব পাটুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩০৪, শিক্ষক রয়েছে মাত্র দু'জন। চর গঙ্গামতি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১৫১, শিক্ষক দুইজন। এর মধ্যে আবার একজনকে বদলির অনুমতি দিয়ে রেখেছেন। মধ্য পাটুয়া বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৭১, শিক্ষক দুইজন। গোলবুনিয়া বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১০২, শিক্ষক দুইজন। চরপাড়া পক্ষীয়া পাড়া বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৯০, শিক্ষক দুইজন। বৌলতলী সৈয়দপুর বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১০২, শিক্ষক দুইজন। পশ্চিম ধানখালী বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১০২, শিক্ষক দুইজন। এর মধ্যে একজনকে অফিসে এনে অফিসের কাজ করার তিনি। এছাড়া আরও অন্তত: ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫০ এর উর্ধ্বে শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক রয়েছে মাত্র তিনজন করে। এসব বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান স্বাভাবিক রাখতে কোন শিক্ষকের পদায়ন হয়নি দীর্ঘ দিনেও। অথচ নাচনাপাড়া বাসন্তী মন্ডল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ জন শিক্ষক থাকার পরও গোলবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সহকারী শিক্ষিকা লাইজু আখতারকে ডেপুটেশনে পদায়ন করা হয় বাসন্তী মন্ডল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। একইভাবে মরিচ বুনিয়া বিদ্যালয় থেকে ইসলামপুর বিদ্যালয়ে সুস্মিতা মিত্র কে পদায়ন করা হয় ডেপুটেশনে। আরামগঞ্জ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব ছোট বালিয়াতলী বিদ্যালয়ে বৃষ্টিকে এবং পূর্ব সোনাতলা থেকে আমিরাবাদ বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে পদায়ন করা হয় শিউলি বেগমকে। এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বেশ কয়েকটি ডেপুটেশনের আদেশ । ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই এই ডেপুটেশন বদলি বাণিজ্য করছেন ইউপিইও, এমনই দাবি সূত্রটির।
গোলবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বাদল বলেন, 'লাইজু আখতারকে অফিস ডেপুটেশন বদলি দেয়ায় এখন মাত্র দুই জন শিক্ষক দিয়ে প্রাক থেকে পঞ্চমের ১০২ জন শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করাতে হচ্ছে । শিক্ষিকা লাইজু শিক্ষা অফিসের সাথে কন্ট্রাক্ট করে ডেপুটেশন বদলি নিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।'
দক্ষিণ পূর্ব ছোট বালিয়াতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, 'আমার বিদ্যালয়ে ১২৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষকের ৬টি পদ থাকলেও কর্মরত আছে ৪ জন। এর মধ্যে ডেপুটেশনে একজন শিক্ষক তার সুবিধামতো বিদ্যালয় যায় এবং অপর একজন এখানে আসে। এটা কিভাবে হয়, তা সবাই বোঝে।'
ডেপুটেশন বদলি নেয়া শিক্ষক বৃষ্টির কাছে জানতে চাইলে, তিনি অফিসের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। অপর শিক্ষক সুস্মিতা মিত্র'র পরিবার বিনা তদ্বিরে ডেপুটেশন বদলি হয়েছে বলে দাবি করেন। তবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত পক্ষীয়া পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাসরুমা পারভীন বলেন, 'আমি দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর অসুস্থ অবস্থায় ডেপুটেশন বদলি পেতে অফিসে ম্যামের কাছে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমারটা হয়নি।'
এদিকে উপজেলা শিক্ষা অফিসের কোন ধরনের অনুমতি ছাড়াই বিদেশে চলে যান মাঝের পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মিমি রাখাইন ও চর চান্দু পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নাহিদা আক্তার সুমি। এছাড়া ২৪ এর ৫ আগস্টের পরে রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন ইটবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহমুদ আলম পলাশ ও গোলবুনিয়া-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. জহিরুল ইসলাম । উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তদারকি আছে শুধু কাগজে কলমে, বাস্তবে নেই। অফিস ব্যস্ত দুর্নীতি অনিয়মে, এমন অভিযোগ একাধিক সূত্রের।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের হাজিরা খাতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিদা বেগম মে'২৬ মাসের ১৪ তারিখ পর্যন্ত একদিনে স্বাক্ষর করেছেন। অপর দিনগুলোর হাজিরা ফাঁকা। একইভাবে ২৩ জুন'২৬ তারিখে হাজিরা খাতায় দেখা যায় কর্মকর্তা কর্মচারীদের স্বাক্ষরের ঘর ফাঁকা। অথচ ২৪ জুন অফিসে এসে একদিনে হাজিরা খাতার স্বাক্ষর আপডেট করা হয়।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির একাংশের সভাপতি মো. শাহাবুদ্দিন তালুকদার বলেন, 'আমার সাথে এখন অফিসের যোগাযোগ কম। তাই অনেক তথ্যই আমার কাছে নেই, অন্ধকারে আছি। তবে অফিসের বিষয়ে শিক্ষকদের কাছে অনেক কিছুই শুনি।'
প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মিজানুর রহমান বলেন, 'কোন শিক্ষক বলতে পারবে না, কারো কাছ থেকে কোনো অনৈতিক সুবিধা নিয়েছি। এছাড়া উন্নয়ন বরাদ্দের অফিস পার্সেন্টেজের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না বলে জানান।'
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিদা বেগম বলেন, 'আপনি খোঁজ নেন ক্ষুদ্র মেরামত, স্লিপ, ইমার্জেন্সি ইন এডুকেশন ও নির্বাচনী ভোট কেন্দ্র সংস্কারের কাজ যথাযথভাবে হয়েছে কিনা। তারপরে আপনার সাথে কথা বলবো।' শাহিদা বেগম আরও বলেন,' ডেপুটেশন বদলী আগের ডিপিইও স্যার করে গেছে। আমার সময় দু'একটি হয়েছে, তাও নেতাদের সুপারিশ ছিল। আমার অফিস কারো কাছ থেকে এক কাপ চাও খায় নি।'
জেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাসুদ করিম বলেন, 'আপনার কাছ থেকে প্রাথমিকের অভিযোগের বিষয়ে জানতে পারলাম, যা আমাকে কেউ অবগত করেনি। এক কথায় বলবো সঠিক হয়নি। আমি অবশ্যই সাডেন ভিজিটে কলাপাড়ায় যাবো এবং পরিদর্শন করে এ বিষয়ে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেবো।'
মাসুদ করিম আরও বলেন, ' দুইজন শিক্ষক দ্বারা যে সকল বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে আমি জানলে সেখানে যে কোনোভাবে ডেপুটেশনে শিক্ষক দেয়া হতো।'

