আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন - COP31 : বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন মুন্না
মো : আরিফুর রহমান সুজন :
বরগুনার বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নে জন্ম মো. খায়রুল ইসলাম মুন্নার। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় তিনি ছিলেন শিশু। সেই দুর্যোগে তার পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। উপকূলের মানুষের জীবনে দুর্যোগের প্রভাব, অনিশ্চয়তা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম তার কাছে তাই কেবল দূর থেকে দেখা কোনো বাস্তবতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিজের পরিবারের অভিজ্ঞতাও।
শৈশবের সেই অভিজ্ঞতা আর উপকূলের মানুষের জীবনসংগ্রাম তাকে ধীরে ধীরে ভাবিয়েছে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলো নিয়ে। কেন উপকূলের মানুষ বারবার দুর্যোগের ক্ষতির মুখে পড়েন? কেন তাদের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ জরুরি? আর তাদের অভিজ্ঞতা ও দাবিগুলো জাতীয় পর্যায়ে কতটা গুরুত্ব পায়?
তার পথচলা সহজ ছিল না। উপকূলের একটি উপজেলা থেকে কাজ শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে নিজের পরিচয় তৈরি করা, তরুণদের সংগঠিত করা এবং জলবায়ু নিয়ে কাজের সুযোগ তৈরি করতে তাকে ধাপে ধাপে এগোতে হয়েছে। প্রায় সাত বছরের এই প্রচেষ্টায় তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের কাজের পরিসর ও নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা।
এবার সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন COP31-এ অংশ নিতে যাচ্ছেন তিনি। তার লক্ষ্য, বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের বাস্তবতা, জলবায়ু অভিযোজনের চাহিদা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরা।
মুন্নার বাবা মো সিদ্দিকুর রহমান একজন ব্যবসায়ী। মা খাদিজা আক্তার বেবী গৃহিণী। তার ছোট ভাই আরিফুল ইসলাম মান্না একজন শিক্ষার্থী। তিনিও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন।
স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের মধ্য দিয়ে মুন্নার পথচলা শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে তিনি বুঝতে পারেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সংগঠিত উদ্যোগ ও দক্ষ তরুণ নেতৃত্ব। সেই ভাবনা থেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গ্রিন পিস ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (GPYDS)। বর্তমানে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
GPYDS-এর কাজের কেন্দ্রে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশ সুরক্ষা, যুব নেতৃত্বের বিকাশ এবং শিশু, কিশোরী ও নারীদের অধিকার। বরগুনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া উদ্যোগটি এখন বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও ঢাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এক হাজারের বেশি তরুণ স্বেচ্ছাসেবক।
জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক কাজের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, কিশোরী ও নারীদের স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং সামাজিক উন্নয়নেও উদ্যোগ রয়েছে তাদের।
এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি বিভিন্ন যুব ও জলবায়ুবিষয়ক উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন। ২০২৬ সালে তিনি LCOY Bangladesh-এর যোগাযোগ ও গণমাধ্যমবিষয়ক নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ বরিশাল বিভাগের সভাপতি এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ইয়ুথ অ্যাডভাইজরি প্যানেলের সদস্য এবং কান্ট্রি ম্যানেজমেন্ট টিমে যুব প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এসব অভিজ্ঞতা তাকে তরুণদের মতামত, যোগাযোগ এবং জলবায়ুবিষয়ক আলোচনার সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়নের শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি জলবায়ু সংকটের তথ্য ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা মানুষের কাছে সহজভাবে তুলে ধরার বিষয়েও আগ্রহী।
২০২৬ সালের নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন COP31-এ অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মুন্না। বরগুনা জেলা থেকে এই প্রথম তরুণ জলবায়ু কর্মী হিসাবে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তার জন্য উপকূলের মানুষের অভিজ্ঞতা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ইতিমধ্যে তিনি সম্মেলনে অংশ নিতে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থান করছেন।
COP31-এ তার বিশেষ আগ্রহ থাকবে জলবায়ু অভিযোজন (Adaptation) এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা (Loss and Damage) বিষয়ে। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি, স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজনের বাস্তবতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা অনুসরণ করতে চান তিনি।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার চাহিদা ও অভিজ্ঞতা জাতীয় পর্যায়ের জলবায়ু আলোচনায় তুলে ধরার এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পরিকল্পনা রয়েছে তার। গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমেও উপকূলের মানুষের জীবন, সংকট ও সম্ভাবনার গল্প আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে চান তিনি।
এ জন্য GPYDS-এর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা, তরুণদের জলবায়ুবিষয়ক দক্ষতা বৃদ্ধি, গণমাধ্যম ও যোগাযোগের ব্যবহার বাড়ানো এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন নেটওয়ার্কের সঙ্গে সহযোগিতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
বরগুনার বেতাগী থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রায় সামনে আরও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে মুন্নার কাজের মূল প্রেরণা একই যে উপকূল তাকে বাস্তবতা চিনিয়েছে, সেই উপকূলের মানুষের অভিজ্ঞতা ও দাবি আরও দূর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া। COP31 তার সেই প্রচেষ্টার একটি নতুন অধ্যায় হতে যাচ্ছে।
মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন
আপনি ও পছন্দ করতে পারেন
সর্বশেষ
জনপ্রিয়
আর্কাইভ!
অনুগ্রহ করে একটি তারিখ নির্বাচন করুন!
দাখিল করুন

