
গ্রামীণ ঐতিহ্যকে ফিরাতে যুব সমাজের উদ্যােগে লাঠি খেলা
মামুন হোসেন, পাবনা:
দিনে দিনে আবহমান গ্রাম-বাংলা থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক কিছুই, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালী সংস্কৃতির এক চিরচেনা অবিচ্ছেদ্য অংশ লাঠি খেলা। জানা যায়, একসময় ব্রিটিশ শাসনামলে অভিভক্ত বাংলার জমিদাররা নিরাপত্তার জন্য লাঠিয়াল বাহিনীদের নিযুক্ত করতো। আবার ইংরেজবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনেও বাঙালি লাঠিয়ালরা ছিল দুশ্চিন্তার কারণ। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবী চৌধুরানীর উপন্যাসেও বাংলার লাঠি বিষয়ে একটি পূর্ণ উপচ্ছেদ লিখেছিলেন তিনি। বাঙালী লাঠিয়ালদের লাঠির আঘাতে নাকি ভেঙে যেত অত্যাধুনিক বন্দুকও। এছাড়াও স্বদেশী আন্দোলনের সময়েও বিপ্লবীরা জনগণের উদ্দেশ্যে নিয়মিত লাঠি খেলার আয়োজন করতেন।
বাংলাদেশের নরসিংদী ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইত্যাদি অঞ্চলে এখনও জমি দখলের জন্য মানুষ লাঠি দিয়ে মারামারি করে। তবে কালের পরিক্রমায় গ্রামবাংলা থেকে এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটি হারিয়ে গেলেও সেই গ্রামীণ ঐতিহ্যকে ফিরাতে পাবনার চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল সিদ্ধিনগর গ্রামে ব্যতিক্রম এই খেলার আয়োজন করেন এলাকার যুব সমাজ ও হান্ডিয়াল ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ইসাহক আলী। ঈদকে আরও উৎসবমুখর করে তুলতে সিদ্ধিনগর বটতলা সবুজ চত্বরে এক দিনব্যাপী এই খেলাটি আয়োজন করেন তারা। এসময় বিভিন্ন গ্রামের বর্ষিয়ান লাঠিয়ালের অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রাণবন্ত হয়ে উঠে খেলার মাঠ।
গ্রাম বাংলা থেকে হারিয়ে যাওয়া এই খেলাকে উপভোগ করতে মাঠে ছুটে আসেন নানা বয়সের হাজারো মানুষ। এসময় ঢাক-ঢোল আর বাঁসির সুরে লাঠিয়ালদের নৃত্য কৌশলে মুখরিত হয়ে উঠে চারিপাশ। দর্শনার্থীদের দাবি প্রতিবছরই যদি এমন আয়োজন করা হয় তাহলে বর্তমানে যুব সমাজ অনেকটাই মাদক ও অনলাইন জগত থেকে বের হয়ে আসবে।
লাঠিয়ালরা জানান, এই খেলার জন্য ব্যবহৃত হয় বাঁশ ও কাঠের লাঠি। শৈল্পিক কৌশলের সঙ্গে প্রত্যেক খেলোয়ার তাদের নিজ নিজ লাঠি দিয়ে প্রদর্শন করেন রণকৌশল। তারা জানান, একসময়ে বলিষ্ঠ যুবকেরাই শুধু এই খেলায় অংশ নিত। তবে বর্তমানে শিশু থেকে শুরু করে যুবক বৃদ্ধ সব বয়সের পুরুষরাই এখন লাঠিখেলায় অংশ গ্রহণ করে।
তারা জানান, আগের প্রশিক্ষিত খোলোয়াররা অনেক শৈল্পিক কৌশল দেখালেও এখন শুধু লাঠি দিয়ে হয় সড়কি, ফড়ে, ডাকাত ডাকাত, বানুটি, বাওই জাক, নড়ি-বাড়িসহ বেশ কিছু খেলা দেখানো হয়।
খেলার নিয়ম সম্পর্কে খেলোয়াররা জানান, এই খেলায় প্রতিযোগীরা কাঠ ও বাঁশের লাঠি দিয়ে আত্মরক্ষা ও প্রতিপক্ষকে আঘাত করার কৌশল প্রদর্শন করেন। এই খেলাটি শুধু বিনোদন নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক। তবে ক্রীড়া ও আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে এই খেলাটি আবারও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। তারা জানান, যারা এখনও এই খেলাটি দেখেননি তাদের উচিত নিজ চোখে এই খেলাটি দেখে ঐতিহ্যের স্বাদ নেওয়া।
কথা হয় খেলা দেখতে আসা জামিনুলের সাথে তিনি জানান, আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অংশ এই লাঠি খেলা। এই খেলাটি গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী যুদ্ধকৌশল ভিত্তিক খেলা। তিনি জানান, একসময় আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হতো এই খেলাটি। বিশেষ করে বীর বাঙালীর স্বাধীনতা সংগ্রামে লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু নিজ গ্রামে নয় খেলাটি ছড়িয়ে পড়ুক সারাদেশে এমন প্রত্যাশাই তার।
খেলা দেখতে আসা মাহমুদা খাতুনের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, অনেকদিন পর খেলাটি দেখে খুব ভালো লেগেছে। তিনি জানান, কালের আবর্তে এই খেলাটি হারিয়ে গেলেও বর্তমানে গ্রামবাংলার লোকজও মেলা, ঈদ এবং পূজা-পার্বণ সহ বিভিন্ন উৎসবে এই খেলাটি এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এই খেলাটি গ্রাম বাংলার লোকসংস্কৃতি থেকে এখন অনেকটাই হারিয়ে যাওয়ায় পথে।
খেলা দেখতে আসা হাফিজুর রহমান নামের একজন জানান, প্রায় বছরই ঈদে তাদের গ্রামে এই খেলাটি হয়ে থাকে। তাদের এলাকার যুব সমাজকে মাদক ও মোবাইল ফোনের আসক্ত থেকে মুক্ত রাখতে এলাকাবাসী নিজ উদ্যােগে এই খেলার আয়োজন করে। তাই গ্রামে ঈদ আনন্দ বাড়াতে প্রতিবছরই এমন খেলা আয়োজনের দাবি তার।
কথা হয় আয়োজক কমিটির অন্যতম সদস্য সরোয়ার হোসেনের সঙ্গে তিনি জানান, গ্রাম বা শহর সব জায়গাতেই এখন তরুণ প্রজন্ম সোসাল মিডিয়ার উপর নির্ভর। তারা আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে না। তাই যুব সমাজের মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও সংস্কৃতি তুলে ধরতেই এমন আয়োজন। ভবিষ্যৎতে গ্রাম-বাসীকে সাথে নিয়ে আরও বৃহৎ পরিসরে এ আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
হান্ডিয়াল ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এফ এম ছহির উদ্দিন স্বপন'র সাথে কথা হলে তিনি জানান, ঢাক-ঢোলা আর কাঁসার ঘন্টার তালে তালে চলছে লাঠির কসরত। প্রতিপক্ষের লাঠির আঘাত থেকে নিজেকে রক্ষা ও পাল্টা আঘাত করতে ঝাঁপিয়ে পরেন লাঠিয়ালরা। তাতে উৎসাহ দিচ্ছেন শত শত দর্শক। আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয়দের মাঝে ছিল উৎসবের আমেজ। দেখে মনে হবে আবার যেন ফিরে এসেছে সেই বাংলার চিরচেনা রুপ। তিনি জানান, যুব সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে এই লাঠি খেলা। তাই নিয়মিত এ ধরনের খেলাধুলা আয়োজনের দাবি জানান তিনি।
কথা হয় চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ মো. আব্দুর রহিম'র সাথে তিনি জানান, বর্তমান সমাজ থেকে অন্যায় অপরাধ দূর করতে ও হারানো ঐতিহ্য ধরে রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে এই লাঠি খেলা। তিনি জানান, বিপথগামী যুব সমাজের মাদকাসক্ততা ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে লাঠি খেলার মত আয়োজন পথ দেখাবে, যুক্ত করবে সম্প্রীতির বাঁধনে। নিয়মিত এ আয়োজনের জন্য পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানান তিনি।
এবিষয়ে পাবনা-৩ সাবেক সংসদ সদস্য কে এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া এই খেলাকে আজও টিকিয়ে রেখেছেন এলাকার সাধারণ মানুষ। তিনি জানান, চলনবিল অধ্যুষিত এই প্রত্যান্ত এলাকায় এমন আয়োজন সত্যিই প্রসংসনীয়। তবে এই গ্রামীন ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলাকে টিকে রাখতে নিয়মিত এমন আয়োজন ও লাঠিয়াল বাহিনীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হলে খেলাটি আবারও নবরূপে ফিরে আসবে বলে জানান তিনি।
পরে খেলা শেষে বিজয়ীদের মাঝে পুরুস্কার বিতরণ করা হয়। গ্রামীন ঐতিহ্য থেকে হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্যকে বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন এলাকার সচেতন মহল।
মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন
আপনি ও পছন্দ করতে পারেন
সর্বশেষ
জনপ্রিয়
আর্কাইভ!
অনুগ্রহ করে একটি তারিখ নির্বাচন করুন!
দাখিল করুন