Dark Mode
Tuesday, 28 July 2026
ePaper   
Logo
প্রাচীনকাল হতে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সমুদ্রপথে বাতিঘরের পথচলা

প্রাচীনকাল হতে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সমুদ্রপথে বাতিঘরের পথচলা

মোঃ জাহিদুল ইসলাম

প্রকৃতপক্ষে মানুষের প্রয়োজন থেকেই আবিষ্কারের নেশা ঘনীভূত হতে থাকে। মানুষের প্রয়োজন যতই বাড়তে থাকে ঠিক একইভাবে আবিষ্কারের নেশার ততই মানুষকে নতুন আবিষ্কারের পথ দেখায়। আর এই আবিষ্কারের নেশা পথ ধরে ছুটে চলতে চলতে মানুষ দেখা পায় আবিষ্কারের স্বপ্নের বাতিঘরের বাস্তবিক রূপ।

আর এই বাতিঘরের বাস্তবিক রুপই হচ্ছে আধুনিক মানব সভ্যতার অগ্রগতির অভিমুখ।ইতিহাসের পরিক্রমায় নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বাতিঘর নির্মাণ আজ এক স্থায়ী রূপ পেয়েছে।বাতিঘর (Light in the House- Lighthouse) মানব সভ্যতার এক ঐতিহাসিক আবিষ্কার। এটি লাইট হাউস নামেও পরিচিত। বাতিঘর বা লাইট হাউস হচ্ছে এক ধরনের সুউচ্চ মিনার, টাওয়ার বা দালান, যেখান থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় আলো ফেলে সমুদ্রে নাবিকদের দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়। সমুদ্রের অগভীর অঞ্চল সম্পর্কে নাবিককে সতর্ক করতে বাতিঘর ব্যবহার করা হয়।

প্রাচীনকাল থেকে সমুদ্রগামী নাবিকেরা আকাশের তারার উপর তীক্ষ্ণ নজর রেখে পথ চলতো।একপর্যায়ে মানুষ বাতিঘর বানানোর ব্যাপারে চিন্তা করে এবং বানায়। পৃথিবীর সবথেকে বিখ্যাত ঐতিহাসিক লাইট হাউজ বা বাতিঘর হচ্ছে আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর। যে মানুষটি প্রথম নাবিকদের এই আতঙ্ক থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন তার নাম হেনরি উইনস্ট্যানলি। লাইট হাউজ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পথিকৃত হিসেবে তার নাম বাতিঘর নির্মাণ ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা রয়েছে। উইনস্ট্যানলি পেশায় ছিলেন একজন জাহাজ ব্যবসায়ী।

বাতিঘরের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব সময়ে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া বাতিঘর থেকে শুরু করে আধুনিককালের সাম্প্রতিকতম বাতিঘরের উদ্দেশ্য একই।বিশেষ ব্যবস্থাপনায় আলো ফেলে সমুদ্রের নাবিকদের সঠিক দিক নির্দেশনা দেওয়া এবং সমুদ্রের অগভীর অঞ্চল সম্পর্কে যুগপৎ সতর্ক করা। বাতিঘর ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে প্রকৃতির অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের অদম্য লড়াইয়ের গল্প। এক সময় মানুষের জীবনযাত্রার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিল সমুদ্র। বেঁচে থাকার জন্য খাবারের সংস্থান করতে কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে সমুদ্র যাত্রা ছিল অবধারিত।

প্রাচীনকালে সমুদ্রে চলাচল এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যাতায়াতের জন্য নাবিকরা কিছু নিয়ম অনুসরণ করে চলত। নাবিকেরা সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই কাঠের তৈরি বড় জাহাজ বা নৌকা নিয়ে ছুটতো সমুদ্রের পথে।আবার সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বেই তীরে সেই জাহাজ বা নৌকা কোন দ্বীপে ভেড়ানোর অথবা বাড়ি ফেরার চেষ্টা করত নাবিকরা। কিন্তু কখনও কখনও প্রকৃতির দুর্যোগপূর্ণ হিংস্রতার কাছে তাদেরকে আত্মসমর্পণ করতে হতো। প্রাচীনকালের মানুষ প্রকৃতির কাছে বিপর্যস্ত হয়েছে বারবার। সূর্যাস্তের পরও অনেক সময় তাদের জাহাজ বা নৌকা নিয়ে কোন দ্বীপে ভেড়ানো অথবা বাড়ি ফেরা অনেক কঠিন হয়ে পড়তো। প্রকৃতির কারণে সূর্য ডোবার আগে নাবিকেরা ঘরে ফিরতে না পারলে তাদের আত্মীয়স্বজনেরা আগুন জ্বালিয়ে সমুদ্রের তীরে অপেক্ষা করতেন। আগুন জ্বালিয়ে তীরের নিশানা দেখানোর ধারণা থেকেই আবিষ্কৃত হয় বাতিঘর। যুগ যুগ ধরে এডিস্টোন রক ছিল নাবিকদের কাছে এক বিভীষিকার নামান্তর।

বিশেষ করে রাতের বেলা কোনো জাহাজই ওই পথ দিয়ে যেতে চাইতো না। অনেক সময় পথ ভুলে বা জোয়ারের পানিতে পাহাড়টিকে দেখতে না পেয়ে কোনো জাহাজ ওই এলাকা অতিক্রম করার চেষ্টা করতো তখনই ঘটতো বড় ধরনের বিপর্যয়।এ ছাড়াও সমুদ্র সৈকতের যেসব এলাকায় বেশি প্রবাল রয়েছে এবং যেসব প্রবাল জাহাজের ক্ষতি করতে পারে- এমন সব জায়গা সম্পর্কেও বাতিঘর জাহাজগুলোকে আলোক সংকেত দিয়ে থাকে।

বহু যুগ ধরে এই বাতিঘর সমুদ্রে নাবিকদের পথ চলতে সহায়তা করে আসছে। একইভাবে সমুদ্রে নাবিকদের পথচলা নিরাপদ করতে ভূমিতে থাকতো একঝাঁক বাতিঘর। প্রাচীনকালে মানুষ সমুদ্রের অগভীর সৈকত আর প্রবাহ সৈকত চিহ্নিত করতে পাহাড়ের ওপরে আগুনের কু-লি জ্বালিয়ে রাখত। পরবর্তীকালে কাঠ জ্বালিয়ে দূর সমুদ্রের নাবিকদের সতর্কবার্তা দেওয়া হতো। আলোর উৎস হিসেবে মূলত খোলা আগুন এবং পরে মোমবাতি দ্বারা আলোকিত, আরগ্যান্ড ফাঁপা বাতির বাতি এবং প্যারাবোলিক প্রতিফলক ইত্যাদি বিভিন্ন পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়েছিল।

বর্তমানে অনেক বাতিঘরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাত্রিকালে বাতি জ্বলার এবং ভোরবেলা নিভিয়ে দেয়ার বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রাচীনকাল হতে বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির যুগ পর্যন্ত বাতিঘরগুলি মূলত জীবনের চ্যালেঞ্জ এবং কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে নাবিকদের নেভিগেশন উপস্থাপন করে আসছে।এছাড়াও বাতিঘরগুলি বিপজ্জনক উপকূলরেখা, বিপজ্জনক শোল , প্রাচীর , শিলা এবং বন্দরগুলিতে নিরাপদ প্রবেশ চিহ্নিত করার পাশাপাশি বায়বীয় নেভিগেশনেও সহায়তা করে। তারা সমুদ্রে নির্বিঘ্নে যাতায়াতের জন্য দিকনির্দেশ, নিরাপত্তা এবং আশার অনুভূতি প্রদান করে আসছে।

লাইটহাউসগুলি অবশ্যই চলার গুরুত্বের প্রতীক, জ্ঞাত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং অন্ধকার বা অনিশ্চয়তার সময় আমাদের পথ খুঁজে বের করার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। নাবিকরা অর্থাৎ সমুদ্রের পথের পথিকের যেন আলো দেখে সহজে বুঝতে পারে সেজন্য তীরের বাতিঘরগুলি সাধারণত সাদা রঙের হয়। আর খোলা সমুদ্রে বা হালকা পটভূমিতে বিপরীত রঙের সুস্পষ্ট ব্যান্ড সাধারণত লাল বা কালো ব্যবহার করা হয়।

বাতিঘরের সৃষ্টির শুরুর ইতিহাস হতে আজ পর্যন্ত বেশিরভাগ বাতিঘরগুলির নামকরণ করা হয়েছিল তাদের অবস্থানের জন্য। তবে বেশ কয়েকটির নামকরণ করা হয়েছিল এমন জাহাজের নামে যা একটি বাতিঘর তৈরির আগে এসব বাতিঘরের কাছাকাছি ধ্বংস হয়েছিল।বেশিরভাগ বাতিঘরের উপরেও কয়েকটি কক্ষ থাকে। মোটামুটি ১০০ ফুট (প্রায় ৩১ মিটার) উচ্চতায় একটি আলো ধরে দিলে আলোর ভৌগলিক পরিসর হিসাবে দিগন্তের ১৫ ফুট উপরে একজন পর্যবেক্ষকের পরিসর হবে প্রায় ১৬ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ৩০ কি.মি.)। বাতিঘরের আকৃতি হলো একটি গম্বুজ বিশিষ্ট ছাদের মত এক কক্ষ বিশিষ্ট ঘর (যা বীকন নামে পরিচিত) যেখানে লণ্ঠনের মত দেখতে বড় বড় জানালা রয়েছে।

টাওয়ারের শীর্ষে ওঠার জন্য একটি সর্পিল সিঁড়ি (বা কখনও কখনও একটি মই) ব্যাবহার করা হয়। বাতিঘরের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে এখনও বর্তমান পর্যন্ত বাতিঘরের এই প্রযুক্তি চালু রয়েছে। প্রথম হতে শুরু করে আজ পর্যন্ত সবগুলো বাতিঘরের মধ্যে মধ্যে প্রায় সবগুলোকেউ স্বয়ংক্রিয় করা হয়েছে।প্রাচীনকালে একটা সময় এই বাতিঘর ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ের কারণে অপারেশনাল বাতিঘরের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছিল।

এরপর অনেক সস্তা, আরও পরিশীলিত এবং কার্যকর ইলেকট্রনিক ন্যাভিগেশনাল সিস্টেমের আবির্ভাবের পর থেকে তাদের ব্যবহার আরও অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। বর্তমানে সবগুলোকে আধুনিকায়ন করে এর ব্যাপকতা এবং ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

লেখক, নেটওয়ার্ক টেকনিশিয়ান (আইসিটি সেল) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

Comment / Reply From

Vote / Poll

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলা বন্ধ করতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগ যথেষ্ট বলে মনে করেন কি?

View Results
হ্যাঁ
0%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%

Archive

Please select a date!