বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজরিত ঝালকাঠির বধ্যভূমি
ঝালকাঠি প্রতিনিধি
শোক আর গর্বগাঁথা ঝালকাঠি জেলার সবচে বড় বধ্যভূমি সুগন্ধা পাড়ের পৌর খেয়াঘাট বধ্যভূমিতে কেঁদে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ঝালকাঠি শহরের প্রবীণ ব্যক্তিরা আজও সে স্মৃতি স্মরণ করেন। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজরিত সেদিনের গল্প শুনিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী আজকের প্রবীণ ব্যক্তিরা।
শহরের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, সদ্য কারামুক্তির পর বঙ্গবন্ধু দেশের বিভিন্ন স্থানে ছুটে যান প্রিয় স্বদেশের দৃশ্যপট স্বচোখে দেখতে। দখিন জনপদের এ জেলা ঝালকাঠিতেও আসেন জাতির পিতা। ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময় সুন্দরবনে জাহাজে করে পরিদর্শনে যান বঙ্গবন্ধু। ফেরার পথে ঝালকাঠি আসেন মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ হারানো শহীদের খোঁজ নিতে। সঠিক তারিখটা কেউ বলতে পারেননি।
ঝালকাঠি কবিতাচক্রের সভাপতি সাংস্কৃতিকজন মনোয়ার হোসেন খান জানান, বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী জাহাজটি নোঙর করে ঝালকাঠির বর্তমান ঝালকাঠি স্টিমারঘাটে। ঝালকাঠি জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতৃবৃন্দসহ হাজারো মানুষ ছুটে যান সেখানে। বঙ্গবন্ধু সেখান থেকে ঝালকাঠি জেলার সবচে বড় বধ্যভূমি শহীদ স্মরনী সড়কে বর্তমান ঝালকাঠি শহরের পৌরসভা খেয়াঘাট এলাকায় আসেন।
সুগন্ধা নদীর এই স্থানটিতে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ১০ হাজার মানুষকে পাক-বাহিনী ও তাদের দোসররা হত্যা করে। নদী পাড়ে হাজারা মানুষের লাশ পড়ে থেকে মাটি চাঁপা পড়ে। বঙ্গবন্ধুর বধ্যভূমি পরিদর্শনকালে সুগন্ধা নদীতে ভাঙন দেখা দেয়। আর সেই ভাঙনে শহীদের শরীরের হাড়-কঙ্কাল নদীতে ভেঙে পড়ছিলো। বঙ্গবন্ধু সে দৃশ্য দেখে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্ধকে বঙ্গবন্ধু তখন নির্দেশ দেন নদীতে ভেঙে পড়তে থাকা শহীদের হাড়-কঙ্কাল সংগ্রহ করে সমাধিত করতে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সে সময় সুগন্ধা পাড়ের শহীদের মাথার খুলি, হাড়, কঙ্কাল তুলে ঝালকাঠির কেদ্রিয় শহীদ মিনারের পাদদেশে সমাহিত করা হয়। আমাদের ঝালকাঠির এই শহীদ মিনার বাংলাদেশের একমাত্র শহীদ মিনার, যেখানে শুয়ে আছেন একাত্তরে শহীদেরা। আমাদের কেন্দ্রিয় শহীদ মিনার ভাষা শহীদের পাশাপাশি একাত্তরের শোক আর গর্বগাঁথা ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বহন করে আসছে, বলেন কবিতাচক্রের সভাপতি মনোয়ার হোসেন খান।
সেদিনের সে শহীদ মিনারটি এখন সংরক্ষণ করা হয়েছে। সাজানো হয়েছে যথাযথ মর্যাদা আর সৌন্দর্যে। শহীদ মিনারটির পাদদেশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালাসহ জাতীয় দিবসে নানা আয়োজন হয়ে আসছে। তবে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজরিত অগণিত শহীদের হত্যার স্মৃতিচিহ্ন পৌর খেয়াঘাটের বধ্যভূমিটি দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকে। ২০১২ সালে সেখানে স্থানীয় তরুণরা নিজেদের উদ্যোগে বধ্যভূমির স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণে এগিয়ে আসে। সর্বশেষ ২০১৯ সালের শেষের দিকে ঝালকাঠি জেলা পরিষদ থেকে কিছু অনুদান দেয়া হয় শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে। বর্তমানে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে।
ঝালকাঠি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সরদার মো. শাহ আলম বলেন, এই নদীর পাড়টি একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাসহ গণহত্যার বিরানভূমি। অগণিত শহীদ এখানে শুয়ে আছেন এখানে। বঙ্গবন্ধু এখানে এসে বেদনায় কেঁদে দু’চোখ ভাসান। ঢাকায় ফিরে গিয়ে ঝালকাঠির অনেক শহীদ পরিবারকে তিনি চিঠি এবং আর্থিক সহযোগিতা পাঠান। ঝালকাঠির অগণিত শহীদ এবং বঙ্গবন্ধুর সেদিসের স্মৃতি রক্ষায় স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানায়। জেলা পরিষদ থেকে প্রাথমিক ভাবে কিছু অর্থ অনুদান দেয়া হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার জন্য। কাজ শুরু হয়েছে। পুরো কাজ সম্পন্ন করতে আরও যা লাগবে আমি সে ব্যবস্থা করব, বলেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সরদার মো: শাহ আলম।
হৃদয়ে একাত্তর নামে স্থানীয় বধ্যভূমি সংরক্ষণ সংগঠনটি জেলা পরিষদের অর্থায়নে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এর কাজ করছে। সংগঠনটির সভাপতি হাছান মাহামুদ বলেন, যেহেতু স্থানটি শহীদ স্মৃতির পাশাপাশির বঙ্গবন্ধুর পরিদর্শণেরও ইতিহাস জড়িয়ে আছে। তাই শহীদের এ স্মৃতিস্তম্ভে ৬টি সিঁড়ি স্থাপন করা হবে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার প্রতীক রেখে বঙ্গবন্ধুর স্মরণে। এছাড়া নদী পাড়ে একটি পাঠাগার নিমার্ণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেখানে একাত্তরের গ্রন্থ এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভিন্ন বই ও ছবি গ্যালারী করা হবে, বলেন হৃদয়ে একাত্তরের সভাপতি হাছান মাহামুদ।
Comment / Reply From
You May Also Like
Latest News
Vote / Poll
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলা বন্ধ করতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগ যথেষ্ট বলে মনে করেন কি?

