ডার্ক মোড
Thursday, 08 October 2026
ePaper   
Logo
মন্তব্য প্রতিবেদন : ​আইএমএফের সাথে চুক্তি বাতিল: সরকারের সাহসী সিদ্ধান্তকে ধন্যবাদ জানাই, কিন্তু অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়নে জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে

মন্তব্য প্রতিবেদন : ​আইএমএফের সাথে চুক্তি বাতিল: সরকারের সাহসী সিদ্ধান্তকে ধন্যবাদ জানাই, কিন্তু অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়নে জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে

হেমায়েত হোসেন

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার কঠোর শর্তযুক্ত ঋণ প্যাকেজ থেকে সরে আসার ঘোষণা নিঃসন্দেহে যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ।

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে (KIB) আয়োজিত 'বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬'-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফের ঋণ চুক্তি বাতিল এবং সংস্থাটির কোনো কঠোর শর্ত আর না মানার সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ করেন।

বহুজাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সার্বভৌম অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই সাহসী উদ্যোগের জন্য সরকারকে সাধুবাদ ও ধন্যবাদ জানানোই যায়।

তবে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাম্প্রতিক পূর্বাভাস এবং দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সূচকগুলো স্পষ্টতই সংকেত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও ভঙ্গুর ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, মুদ্রাস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মন্থরগতির মধ্যে আইএমএফের সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির অবশিষ্ট অর্থ এবং তাদের রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাত সংস্কারের কাঠামো থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকিরও সৃষ্টি করতে পারে।

আইএমএফের নীতি ও শর্তাবলি অনেক সময়ই সাধারণ জনগণ ও স্থানীয় উদীয়মান শিল্পখাতের ওপর অতিরিক্ত ভর্তুকি কর্তন বা করের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে সাময়িক চাপ তৈরি করে। সেই দিক থেকে একটি বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর অর্থনীতির স্বার্থে এমন কঠোর শর্ত মেনে নেওয়া কঠিন। কিন্তু কেবল চুক্তি বাতিল করলেই সমস্যা মিটবে না, বরং এই সিদ্ধান্তের ফলে তৈরি হওয়া সাময়িক শূন্যতা পূরণে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কৌশলগত ও কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এমন পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি, কর ফাঁকি বন্ধ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আধুনিকায়ন অব্যাহত রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।

পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ঘাটতি সামাল দিতে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) প্রবাহ বাড়ানো এবং অপ্রচলিত রপ্তানি খাতকে সচল করতে সুনির্দিষ্ট পলিসি সাপোর্ট প্রদান করতে হবে। বহুজাতিক একচ্ছত্র সংস্থার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ ও আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর (যেমন ADB, AIIB, IDB) কাছ থেকে নমনীয় শর্তে বৈদেশিক সাহায্য ও মূলধনী ঋণ সংগ্রহের উদ্যোগও ত্বরান্বিত করা দরকার।

এছাড়া অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের অবক্ষয় ও খেলাপী ঋণের চাপ কমিয়ে আনতে কঠোর প্রশাসনিক সংস্কার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সেই সাথে শেয়ারবাজার ও মূলধন বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

স্বনির্ভর ও অর্থনৈতিকভাবে আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আইএমএফের শর্তের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার এই ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রশংসনীয়। কিন্তু এই সাহসী উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে সরকার কত দ্রুত এবং সূক্ষ্মভাবে এর বিকল্প অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে পারে তার ওপর।

কোনো বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়া এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে দেশ নতুন অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারে। তাই কালক্ষেপণ না করে অর্থমন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ে একটি আপদকালীন অর্থনৈতিক রোডম্যাপ বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন