বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও হয়রানির অভিযোগ পেশাজীবী পরিষদের
নিজস্ব প্রতিবেদক
সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন, ব্যাপক পেশাজীবী হয়রানি এবং প্রশাসনিক অবহেলার ঘটনা ঘটেছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পেশাজীবী মানবাধিকার পরিষদ। মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনের নেতারা এই অভিযোগ করেন।
পরিষদের আহ্বায়ক ডা. মো. জামাল উদ্দিন চৌধুরী, যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এম ওয়াহিদুজ্জামান এবং সদস্যসচিব কৃষিবিদ এম এম মিজানুর রহমান এই যৌথ বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, তাঁদের সংগঠন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শে বিশ্বাসী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে বলে তাঁরা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
মানবাধিকার সংগঠনটি দাবি করেছে, ‘মব জাস্টিস’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা এবং বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পেশাজীবীদের মধ্যে একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যা সংবিধান প্রদত্ত বাকস্বাধীনতার অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও বিদ্যালয়ের বহু শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো হয়েছে, আবার অনেককে সাময়িক বরখাস্ত ও অন্যায়ভাবে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি প্রকৌশলী, চিকিৎসক, কৃষিবিদ ও আইনজীবীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে গিয়ে নানা বাধা, হামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
দেশের প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহর বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (সাবেক বিএসএমএমইউ) আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপকের পদ বাতিলের তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে বিবৃতিতে। গত ২০ জুন ২০২৪ থেকে এ পর্যন্ত নেওয়া বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার প্রশাসনিক নির্দেশটিকে ‘অমানবিক’ বলে আখ্যায়িত করেছে পরিষদ। তারা বলছে, দেশ-বিদেশে সমাদৃত একজন চিকিৎসকের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার এই পদক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, যেখানে তাঁর নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব ছিল।
জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অবহেলার অভিযোগ তুলে বিবৃতিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হামের টিকা আমদানি করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা সংবিধানের ১৫(ক) ও ১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের লঙ্ঘন। এই ব্যর্থতার কারণে দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং এতে সাত শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া এক লাখেরও বেশি শিশু দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভুগছে, যা জীবন ধারণের অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে গত ২২ জুন তুরাগ থানা এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া সাতজন রাজনৈতিক কর্মীর লাশ তুরাগ নদী থেকে উদ্ধারের ঘটনার কথা উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এই ঘটনার পর পুলিশের দেওয়া বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর ও পরস্পরবিরোধী আখ্যা দিয়ে এর একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। একই সাথে পরিষদের নেতারা সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার দ্রুত তদন্ত, বর্তমান ‘মব কালচার’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি দমন এবং ভবিষ্যতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানান।

