সরকারি রেজিস্টারের পাতা ছেঁড়ার ঘটনায় রাজশাহীর তহশিলদার বদলি
শাহিনুর রহমান সোনা, রাজশাহী
সরকারি খাতার (রেজিস্টার) পাতা ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ ওঠার পর রাজশাহীর এক তহশিলদারকে (ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা) তাৎক্ষণিকভাবে বদলি করা হয়েছে। ‘দ্য কান্ট্রি টুডে’সহ কয়েকটি গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। পরবর্তীতে সরকারি খাতা ছেঁড়ার একটি ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে (ভাইরাল) তা নিয়ে সর্বমহলে তীব্র সমালোচনা ও আলোচনার সৃষ্টি হয়।
তবে এই বদলির আদেশ নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, কারণ দর্শানোর নোটিশ (শো-কজ) বা কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক দণ্ড না দিয়ে কেবল কেন অন্য জায়গায় সরিয়ে দেওয়া হলো, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। রাজশাহীর স্থানীয় রাজনৈতিক ও সচেতন মহলের মধ্যে গুঞ্জন চলছে যে, উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তা বা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির তদবিরে এই বদলির মাধ্যমে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, বোয়ালিয়া ভূমি অফিসে জমি সংক্রান্ত একটি আবেদনের বিষয়ে উভয় পক্ষকে যথাযথ শুনানির সুযোগ না দিয়েই একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এতে সংক্ষুব্ধ পক্ষ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর কাছে আপিল করলে তিনি পূর্বের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। পরবর্তীতে প্রথম পক্ষ আবার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব)-এর কাছে আপিল করলে তিনিও আগের আদেশ স্থগিত করেন এবং আগামী ৭ জুলাই শুনানির দিন ধার্য করেন।
বিষয়টি আপিলাধীন থাকা এবং আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও তহশিলদার সাইফুল ইসলাম বিতর্কিত ওই জমির জোত রেকর্ডটি রহস্যজনকভাবে পুনরায় সচল (Reactivate) করেন। এ বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা তাঁকে প্রশ্ন করলে তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে জোতটি আবার বন্ধ করে দেন এবং ক্ষুব্ধ হয়ে তিনটি সরকারি রেজিস্টার খাতা থেকে নির্দেশনামূলক পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলেন। এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজটিই পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তহশিলদার সাইফুল দাবি করেছেন, তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মৌখিক নির্দেশেই এই কাজ করেছিলেন। তবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাহাতুল করিম মিজান এমন কোনো নির্দেশ দেওয়ার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সংবাদ প্রকাশ এবং ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরপরই সাইফুলকে বদলি করা হয়।
এদিকে, ভুক্তভোগী ও মূল অভিযোগকারী মোসাম্মৎ রেখা অভিযোগ করেছেন যে, প্রয়াত সুজাউদ্দৌলার ওয়ারিশ আসাদুল্লাহ ডিং বোয়ালিয়া থানার সপুরা মৌজায় তাঁর ৩৭ কাঠা জমির নামজারি (মিউটেশন) বাতিলের দাবি জানিয়ে বড়কুঠির সহকারী কমিশনার (ভূমি) আদালতে একটি বিবিধ মামলা (নম্বর ৭৪/১৩/২০২৪-২৫) দায়ের করেন। একই সাথে তিনি ওই জমিসহ অতিরিক্ত কিছু জমি নিজের নামে নামজারি করার আবেদন জানান।
রেখার অভিযোগ, তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভিজিৎ সরকার তাঁর কর্মদিবসের শেষ দিনে (গত বছরের ২১ মে) তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়েই একতরফাভাবে রেখার নামজারিটি বাতিল করে দেন। তবে আদালত অপর পক্ষের অনুকূলেও কোনো নামজারি মঞ্জুর করেনি। রেখার দাবি, বিতর্কিত ওই জমির স্বপক্ষে প্রতিপক্ষের কোনো বৈধ মালিকানা দলিল বা স্বত্ব নেই, তাই তাঁর নামজারি বাতিলের আবেদন করার কোনো আইনি ভিত্তিই তাদের ছিল না।
তিনি আরও জানান, এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে গত ১২ মার্চ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) উভয় পক্ষের নামজারি রেকর্ড বাতিল করে জমিটি তার পূর্বের আরএস (R.S.) জোতে ফিরিয়ে নেওয়ার আদেশ দেন। কারণ, ওই বিতর্কিত সম্পত্তি নিয়ে একটি দেওয়ানি মামলা ইতিমধ্যেই উপযুক্ত আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। পরবর্তীতে প্রতিপক্ষ এই আদেশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব)-এর কাছে আপিল করলে গত ৬ মে আদালত আগের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেন এবং আগামী ৭ জুলাই শুনানির দিন ধার্য করেন। কিন্তু রেখার অভিযোগ, এই শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই প্রতিপক্ষ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদে তাদের নামজারিটি গোপনে আবার পুনর্বহাল করিয়ে নেয়।
মোসাম্মৎ রেখা আরও অভিযোগ করেন যে, প্রতিপক্ষ যেসব নথিপত্রের ওপর ভিত্তি করে মালিকানা দাবি করছে, সেগুলোতে অসংখ্য অসঙ্গতি রয়েছে। বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ায় তারা ২০টি ভিন্ন ভিন্ন দলিলের মাধ্যমে মালিকানা দাবি করলেও, কোন দলিলটি ঠিক কোন নির্দিষ্ট জমির অংশের সাথে সম্পর্কিত, তা তারা কখনোই সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পারেনি। এমনকি তারা একই সম্পত্তির মালিকানা একবার রেজিস্ট্রি করা বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে আমমোক্তারনামার (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) মাধ্যমে দাবি করছে। পাশাপাশি কোনো ধরনের মালিকানা দলিল ছাড়াই কিছু জমির ওপর দাবি খাটিয়ে তা অবৈধভাবে দখলে রাখার চেষ্টা করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তবে অভিযোগকারীর উত্থাপিত এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

