পরবর্তী এশীয় অর্থনৈতিক বিস্ময় রচনায় অংশীদার হতে চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা বিনিয়োগকারীদের পরবর্তী এশীয় অর্থনৈতিক বিস্ময় রচনায় অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আজ বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পপতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী চীনা কোম্পানিগুলোকে তাদের মূল্যশৃঙ্খল বাংলাদেশে সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজারের সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি আমরা চীনা কোম্পানিগুলোকে বৈশ্বিক বাজারে আরও কার্যকরভাবে সেবা দিয়ে সহায়তা করতে পারি।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আপনাদের এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়ের অংশীদার হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। ইতোমধ্যে বহু চীনা বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তারা আমাদের জনগণের কর্মক্ষমতা, আমাদের সহনশীলতা এবং আমাদের বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরতে পারেন। তারা বলতে পারেন বাংলাদেশ সফল হতে পারে।’
তারেক রহমান আরও বলেন, বাংলাদেশকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার জন্য আরও বেশি চীনা কোম্পানির দেশটিতে আসা উচিত।
তিনি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘তাদের বিনিয়োগ যথাযথ মূল্যায়ন পাবে, উদ্বেগ ও প্রত্যাশার বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে এবং আরও গতিশীল ও সংবেদনশীল বিনিয়োগ পরিবেশের মাধ্যমে তাদের প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করা হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ এক বিশাল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের যাত্রাপথের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। আমি স্পষ্টভাবে বলতে পারি, বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত এবং আমাদের অন্যতম দীর্ঘদিনের ও বিশ্বস্ত বন্ধু চীনের সাথে কাজ করতে আগ্রহী।’
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, চীন এখন বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলের আরও উচ্চস্তরে এগিয়ে যাচ্ছে। চীনা কোম্পানিগুলো উন্নত উৎপাদনশিল্প, উচ্চমূল্যের অবকাঠামো এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছে।’
তিনি বলেন, ‘চীন যখন শিল্প ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের আরও উচ্চ ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন উৎপাদনব্যবস্থার কিছু অংশ নতুন, প্রতিযোগিতামূলক ও নির্ভরযোগ্য গন্তব্যের সন্ধান করবে। বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনাময় গন্তব্যগুলোর একটি হতে পারে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা চীনা কোম্পানিগুলোকে তাদের মূল্যশৃঙ্খল বাংলাদেশে সম্প্রসারণের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। ক্রমবর্ধমান বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজারের সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি আমরা তাদের বৈশ্বিক বাজারে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছাতে সহায়তা করতে পারি। এটি একটি পরিপূরক, বাস্তবধর্মী এবং উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক সম্পর্ক। তবে কথার সঙ্গে কাঠামোগত পদক্ষেপেরও মিল থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তাঁর সরকার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে ব্যাপক সংস্কার আনতে একটি কঠোর ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা সরাসরি আমলাতান্ত্রিক জড়তাকে মোকাবেলা করছি। স্বচ্ছতা, পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং গতি বাড়ানোর জন্য আমরা দীর্ঘমেয়াদী নীতির ধারাবাহিকতা উন্নত করছি, একাধিক নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া হ্রাস এবং সরকারি পরিষেবাগুলোকে ডিজিটাইজ করছি।’
তিনি বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী বৈষম্যহীন সুবিধা, মূলধন ও লভ্যাংশ দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ এবং শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা পাবেন।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলছি। এর মধ্যে রয়েছে আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এবং মোংলায় দ্বিতীয় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল।’
তিনি বলেন, ‘এসব অঞ্চলে উন্নত লজিস্টিকস সুবিধা, সমুদ্রবন্দর সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি সেবা, দক্ষ শ্রমশক্তি, সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প-পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারীদের আরও আস্থা, সুস্পষ্ট সুরক্ষা ও আধুনিক বিনিয়োগ কাঠামো প্রদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও চীন দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি হালনাগাদের কাজও এগিয়ে নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বিডা এখন চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষায়িত সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ডেস্ক চালু করেছে। পাশাপাশি চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষায়িত ওয়েবসাইটও চালু করা হয়েছে, যাতে তারা বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, প্রণোদনা ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে সহজে তথ্য পেতে পারেন।’
প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, খুব শিগগিরই চীনে বাংলাদেশে প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ চালু করা হবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য খুবই সহজ। চীনা বিনিয়োগকারীদের সহায়তা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। আমরা আরও কাছে থাকতে, আরও নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে এবং বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজের জন্যে আপনাদের সাহায্য করতে চাই।’
তারেক রহমান বলেন, ‘সরকার সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নেও জোর দিচ্ছে। নতুন লাইসেন্স অনুমোদন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি চলছে, যার ফলে নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ১৫ দিনেরও কম সময়ে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।’
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি ঘোষিত জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা, ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল পরিকাঠামো, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উন্নত বস্ত্রশিল্পসহ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসব উদ্যোগের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগকারী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যাতে আরও সহজে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এবং সুস্পষ্ট ধারণা নিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারে তা নিশ্চিত করা।’
তিনি বলেন, ‘আমি এখানে দাঁড়িয়ে দাবি করব না যে সবকিছুই নিখুঁত। তবে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, আমরা সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবগত, সেগুলোর সমাধানে কাজ করছি এবং ভবিষ্যতেও সেগুলোর সমাধান অব্যাহত রাখব।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, এই ফোরাম থেকে আমরা একটি অভিন্ন সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাই। যাতে এ অঞ্চলের সম্ভাবনাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ ও চীনের পারস্পরিক সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করা যায়।’
ভাষণের শেষে তিনি চীনা বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘বাংলাদেশে আসুন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করুন। সমমর্যাদার এক প্রকৃত অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে আমরা একসঙ্গে সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করি।’
অনুষ্ঠানে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও প্রণোদনা নিয়ে একটি বিশেষ উপস্থাপনা তুলে ধরেন।
সম্মেলনে ১২৫ জন চীনা ব্যবসায়িক প্রতিনিধি অংশ নেন।
এ সময় পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

