দেড় মাসেই ৬২ লাখের জেটি অকার্যকর জোয়ারে বন্ধ নলচিরা ঘাট
হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি:
জোয়ার এলেই পানিতে ডুবে যায় নলচিরা ঘাটের ফেরি র্যাম্প ও পন্টুন জেটির অংশ। তখন ঘাট দিয়ে যাত্রী পারাপার বন্ধ হয়ে যায়। ভাটা না আসা পর্যন্ত অনেককে অপেক্ষা করতে হয় ঘাটেই। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীরা।
ঘাটের এই পরিস্থিতির মধ্যেই প্রায় ৬২ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয়ে অবকাঠামোর কাজ শেষ হয়েছে দেড় থেকে দুই মাস আগে। এত টাকা খরচের পরও জোয়ারের সময় ঘাট ব্যবহার করতে না পারায় কাজের পরিকল্পনা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
নলচিরা ঘাটটি হাতিয়ার মানুষের নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের অন্যতম প্রধান পথ। প্রতিদিন এই ঘাট ব্যবহার করেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, রোগীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ফলে জোয়ারের সময় ঘাট অচল হয়ে পড়লে এর প্রভাব পড়ে পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগের আওতাধীন নলচিরা ঘাটে স্টিল ফ্রেমের কাঠের জেটির সামনে দুটি এমএস স্পাড সরবরাহ ও স্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত দুটি এমএস স্পাড উত্তোলন করে পুনঃস্থাপনের কাজ করা হয়। এসব কাজে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬২ লাখ ৪৬ হাজার টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নলচিরা ঘাটে জোয়ারের পানি ওঠার বিষয়টি নতুন নয়। ঘাটটি নদীভাঙনপ্রবণ এলাকাতেও অবস্থিত। এমন একটি জায়গায় কাজ করার আগে জোয়ারের পানির উচ্চতা, নদীর স্রোত ও ভাঙনের ধরন যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ঘাটে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা নিপু খিলজির সঙ্গে। তিনি বলেন, “এই এলাকার মানুষের নৌপথ ছাড়া তেমন কোনো বিকল্প নেই। একটু জোয়ার হলেই ঘাটের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এত টাকা খরচ করে কাজ করার পরও যদি জোয়ারের সময় মানুষ ঘাট ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে সেই কাজ কতটা কাজে লাগল, সেটা তো প্রশ্ন থাকবেই।তিনি বলেন, “আমরা আগেও বলেছি, এখানে জোয়ারের পানি ওঠে। কাজ করার আগে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বললে সমস্যাটা বুঝতে পারত। শুধু মেরামত করে গেলে হবে না, স্থায়ী সমাধান দরকার।
ঘাটের ইজারাদার আফজাল হোসেন রাবু বলেন,একটু “জোয়ার আসলে দুটি ফেরি র্যাম্প ও পন্টুন জেটি পানির নিচে চলে যায়। তখন যাত্রী পারাপার করা যায় না। ভাটা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। প্রতিদিন অনেক মানুষ এই ঘাট দিয়ে যাতায়াত করেন। তাদের সামলাতে আমাদেরও সমস্যা হয়।
ঘাট ব্যবহারকারীরা জানান, জরুরি প্রয়োজনে নোয়াখালীতে যেতে হলেও জোয়ারের সময় অনেককে ঘাটে তিন চার ঘন্টা বসে থাকতে হয়। বিশেষ করে অসুস্থ রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দুর্ভোগ বেশি। অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।
স্থানীয়দের দাবি, ঘাটের সমস্যা শুধু জেটি মেরামতের মাধ্যমে সমাধান হবে না। নদীর গতিপথ ও ভাঙনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জোয়ারের সময়ও ব্যবহার করা যায়—এমন ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি নৌযান চলাচল ও ঘাট ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর কথাও বলেছেন তারা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রিসাদ আহমেদ বলেন, “নলচিরা ঘাট ভাঙনকবলিত এলাকায় অবস্থিত। নদীর স্রোত ও ভাঙনের কারণে জেটির ওপর চাপ পড়ে। এতে কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেটির অবকাঠামো আগে করা হয়েছিল। পরে নদীর গতিপথ ও ভাঙনের পরিস্থিতি পরিবর্তন হওয়ায় কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে।তিনি বলেন, যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, ঘাটটি দীর্ঘদিন ধরে জোয়ার ও ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকার পরও কেন এমন ব্যবস্থা করা হলো, যা জোয়ারের সময়ই অচল হয়ে পড়ে। তাঁদের মতে, সরকারি অর্থ খরচের আগে ঘাটের বাস্তব পরিস্থিতি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ঘাট পরিদর্শন করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং জোয়ারের সময় নিরাপদে যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের কথা, নলচিরা ঘাট ঠিকমতো সচল না থাকলে শুধু একটি ঘাট নয়, পুরো হাতিয়ার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থাই ব্যাহত।

