
রোজা রাখার ফলে স্বাস্থ্যের উপকারিতা
মোঃ জাহিদুল ইসলাম
রোজা বা সিয়াম ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল ভিত্তির তৃতীয়। পবিত্র রমজান মাসে রোজা পালন করা একটি ফরজ ইবাদত। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রাপ্তবয়স্ক, জ্ঞানসম্পন্ন সুস্থ ব্যক্তির উপর রোজা রাখা ফরজ। প্রবিত্র রমজান মাসে মুসলমানদেরা প্রতিদিন সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার,পাপাচার, কামাচার এবং সেই সাথে যাবতীয় ভোগ-বিলাস থেকেও বিরত থাকার নাম রোযা।
রোজা হচ্ছে এমন একটি ইবাদত যা ব্যক্তির আধ্যাত্মিক উন্নতির পাশাপাশি সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে আরও বাড়িয়ে তোলে। রোজা শুধু ধর্মীয় বিধিবিধানের অংশ নয়। এর ব্যাপকতা বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যনীতিরও একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে। রোজা পালন করার মধ্যে রয়েছে শারীরিক ও মানসিক উপকারিতাও। প্রতিবছর রমজানে প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমান মহান সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ লাভের জন্য ধর্মীয় ইবাদত হিসেবে রোজা পালন করে থাকেন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে দীর্ঘজীবন লাভের জন্য খাওয়া-দাওয়ার প্রয়োজন বেশি নয়।
মূলত পরিমিত খাওয়াটাই দীর্ঘজীবন লাভের চাবিকাঠি। পেট ভর্তি করে খাওয়া মানুষের জন্য বিপদ ডেকে আনে। পেটের এক-তৃতীয়াংশ পানি এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখা উচিত। সারা বছর অতিভোজ, অখাদ্য, কুখাদ্য, ভেজাল খাদ্য খাওয়ার ফলে আমাদের শরীরে যে জৈব বিষ জমা হয় তা দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। রোজা রাখার সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো এক মাস রোজা পালনের ফলে সেসব জৈব বিষ সহজেই দূরীভূত হয়ে যায়। শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও রোজার উপকারিতা অপরিসীম।
খাদ্যাভাব কিংবা আরাম-আয়েশের জন্য মানুষের শরীরের যে ক্ষতি হয় রোজা তা পূরণ করে দেয়। উপবাসকালে শরীরের মধ্যকার প্রোটিন, চর্বি, শর্করা জাতীয় পদার্থগুলো স্বয়ং পাচিত হয়। উপবাসের মাধ্যমে লিভার রক্ত সঞ্চালন দ্রুত হয় ফলে ত্বকের নিচে সঞ্চিত চর্বি, পেশীর প্রোটিন, গ্রন্থিসমূহ এবং লিভারে কোষসমূহ আন্দোলিত হয়। যেসব চর্বি জমে শরীরের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় সেগুলো রোযার সময় দেহের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর জন্য ছুটে যায়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলোর পুষ্টি বিধান হয়। রোযা থাকা অবস্থায় একটি নিদিষ্ট সময় যাবতীয় খানাপিনা বন্ধ থাকার কারনে পাকস্থলী, অন্ত্র-নালী, যকৃত, হৃদপিণ্ডসহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিশ্রাম পায়।
তখন এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিজেদের পুনর্গঠনে নিয়োজিত হতে পারে। পরিমিত পানাহার দেহের অভ্যন্তরীণ যন্ত্রগুলোর সংরক্ষণ এবং হ্নদপিণ্ডের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে থাকে। রোযার পালন করার কারণে ফুসফুসের কাশি, কঠিন কাশি, সর্দি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি রোগ সমূহ নিরাময়েও সহয়তা করে। রোযাব্রত পালনের কারণে মস্তিস্ক এবং স্নায়ুতন্ত্র সর্বাধিক উজ্জীবিত হয়। রোজার শারীরিক উপকারিতার সঙ্গে রয়েছে মানসিক উপকারিতাও। রোজা রাখার সময় স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ কমে যায় যা ব্রেনের কর্মক্ষমতাকে অনেকটাই বাড়িয়ে তোলে। রোজা যেহেতু ধর্মীয় একটি ইবাদত তাই নিয়মিত রোজা রাখার ফলে মানসিক প্রশান্তি অনুভব করা যায়।
এর ফলে মানুষের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা কমে আসে। পরমহিতৈষী ওষুধ বিশেষ হিসেবে রোযা পালনের ফলে বাতরোগ, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত ব্যাধিতে মানুষ কম আক্রান্ত হয়। আলসারের রোগীরা রোযা রাখলে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানি রোগীদের জন্যও রোযা উপকারী। রোজাদার ব্যক্তিদের মনের অশান্তি ও দুশ্চিন্তা দূর হয়-যা উচ্চ রক্তচাপের জন্য মঙ্গলজনক। এছাড়াও বহুমূত্র রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে রোযা খুব উপকারী। এদিকে রোজা পালনের সময় শরীরের কোষগুলো বিশ্রামে থাকে।
এই সময়ে শরীর ডিটক্সিফাইড হয় এবং ইমিউনিটি সেল নতুন করে তৈরি হয়। কিছু কিছু গ্রোথ হরমোন আছে যেগুলোর নিঃসরণ এ সময় বেড়ে যায় যা ওজন কমাতে সাহায্য করে। তবে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের কারণে শরীর উপকারিতাগুলো পায় না। উল্টো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও কমে যায় এবং শরীর সহজেই অসুস্থ হয়ে যায়। এ ছাড়া অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাওয়ার ফলে পেটের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দেয়। শরীরটাকে ভালো রাখার উত্তম উপায় হলো রোজা রাখ।
রোজা রাখার ফলে শরীর স্বাস্থ্যবান হয়। শরীরকে সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান রাখার জন্য রোজার গুরুত্ব অপরিসীম। সুন্দর স্বাস্থ্যবান শরীরের জন্য রোজা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রোজা মানব শরীরের কোনো ক্ষতি করে না। আমাদের রক্তে নানা রকম বর্জ্য পদার্থ এবং ক্ষতিকর পদার্থ ঘুরে বেড়ায়। এই রক্তকে পরিশোধন করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে রোজা। মাঝে মাঝে রোজা, উপবাস বা ফাস্টিং একজন মানুষের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করে তাকে দীর্ঘজীবী করে। যদি সঠিক পদ্ধতিতে রোজা রাখা যায় তাহলে অবশ্যই বাড়তি ওজন কমবে।
বাড়তি ওজন ঝেড়ে ফেলে একজন রোজাদার ব্যক্তি স্লিম, স্মার্ট মানুষে রূপান্তরিত হতে পারে। এতে করে শরীরে নানাবিধ ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। রোজায় পেট খালি থাকার কারণে খাবার হজমের অ্যাসিড এই সময় ধীরগতিতে নিঃসরিত হয় যা হজম শক্তিজনিত নানা সমস্যা দূর করতে সহায়তা করে। যাদের অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার বদভ্যাস আছে তারা এই নিয়মিত রোজা রাখার কারণে এই বদভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন। তা ছাড়া যেকোনো নেশাদ্রব্য থেকে মুক্তি পেতে রোজা একটি কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
পবিত্র রমজানের অন্য একটি ইবাদত তারাবি নিয়েও চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণা প্রমাণিত হয়েছে যে তারাবি নামাজ হৃৎপিণ্ডের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি ও শরীরের পেশি মজবুত করে। মেরুদণ্ডসহ শরীরের অন্যান্য সংযোগস্থল নমনীয় করে ও রক্তপ্রবাহকে অধিক ক্রিয়াশীল করে। তারাবিতে বেশি রুকু ও সিজদার ফলে রক্ত চলাচল ও শ্বাস গ্রহণ প্রক্রিয়ার উন্নতির পাশাপাশি পিঠে, জয়েন্টে ও মাংসপেশিতে ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। জীবনে সফলতা লাভের উদ্দেশ্যে রোজা রাখার গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামই হচ্ছে সুখ ও কল্যাণের চাবিকাঠি। সিয়াম সাধনার ফলে আমরা হব স্বাস্থ্যবান ও পবিত্র আত্মার অধিকারী। আল্লাহ আমাদের সিয়াম ও তারাবি ভালোভাবে আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক, নেটওয়ার্ক টেকনিশিয়ান (আইসিটি সেল) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।