ডার্ক মোড
Sunday, 19 May 2024
ePaper   
Logo
কুলাউড়ায় মনু নদীতে মাছ ধরা উৎসব

কুলাউড়ায় মনু নদীতে মাছ ধরা উৎসব

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় মনু নদীতে উৎসবের আমেজে শত বৎসরের ঐতিহ্যবাহী তিন দিন ব্যাপী ‘মাছ ধরা’ উৎসব শেষ হয়েছে। গত সোমবার শুরু হওয়া এই উৎসব শেষ হয় বুধবার। এ উৎসবে জেলেদের পাশাপাশি সহস্রাধিক বিভিন্ন পেশার সৌখিন মৎস্য শিকারীরা অংশ নেন। মাছ ধরা উৎসবে শিকারির জালে ধরা পড়ে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় প্রজাতির মাছ। তবে স্থানীয়রা জানান, গত বছরের চেয়ে এবার শিকারীদের জালে মাছ কম ধরা পড়ে।

জেলার কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর। এই তিন উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে চলা দীর্ঘ মনু নদীর কুলাউড়া উপজেলা অংশে চলছে এমন ব্যতিক্রমী ঐতিহ্যবাহী উৎসব। ওই উৎসবে অংশ নেন কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, জুড়ী ও রাজনগর উপজেলা থেকে আসা সহস্রাধিক পেশাদার ও সৌখিন মাছ শিকারীরা। আর তা দেখতে ভিড় করছেন দূর-দূরান্ত থেকে আগত সৌখিন মানুষরা। প্রতিবছর খরস্রোতা মনু নদীর পানি কমে আসলে কুলাউড়া উপজেলার হাজিপুর, টিলাগাঁও, পৃথিমপাশা ও শরিফপুর ইউনিয়নের মনু নদীর দুপারের প্রায় হাজার দেড়েক মানুষ এক সঙ্গে মাছ ধরতে নামেন নদীতে। আর এ সময়ের জন্য গ্রামের লোকজন প্রতিবছর অপেক্ষায় থাকেন। সৌখিন মাছ শিকারীরা আগ থেকেই মাছ ধরার উপকরণ জাল নৌকা তৈরি করে রাখেন। নদীতে মাছ ধরা উৎসব কারো জালে মাছ আটকা পড়ছে আবার কারো জালে একেবারের মাছ ধরা পড়ছে না।

গত সোমবার সকাল দশটায় মনু নদীর হাজিপুর ইউনিয়ন অংশে মনু-কটারকোনা রেল ও সড়ক সেতুর পূর্ব স্থান থেকে এই উৎসবের যাত্রা শুরু হয় এবং শেষ হয় দুপুর ২টায়। হাজীপুরের মনু রেল সেতু, কটারকোনা, মাহতাবপুর, টিলাগাঁওয়ের লালবাগ, গাজীপুর ও পৃথিমপাশার ছৈদল বাজার ঢহর (নদীর গভীর অংশ) ছোট বড় বিভিন্ন জাল দিয়ে মাছ শিকার করেন শিকারীসহ স্থানীয় লোকজন।

সৌখিন ও পেশাদার শিকারীরা পলো, কুচা, ঝাকি জাল, প্লেন জাল, টানা জালসহ নানা জাতের ফাঁদ নিয়ে তারা নদীতে মাছ শিকারে নামেন। কেউ নৌকায়, কেউ বা কলাগাছের ভেলায় চেপে। অনেকেই আবার নদীর চর জাগা অথবা শুকনো স্থান থেকে ঝাকি জাল দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করেন। তারা মাছ ধরা দৃশ্য দেখার পাশাপাশি মাছও ক্রয় করেন। প্রথম দিনই সৌখিন শিকারির জালে দেশীয় প্রজাতির রুই. বাউশ, আইড়, পাবদা, বাচা মাছসহ বিভিন্ন ছোট মাছ ধরা পড়ে। মনু নদীর মাছ সুস্বাদু ও সতেজ থাকায় তা কিনতে মানুষের আকর্ষণও বেশি। তবে শুধু কেনা বেচাই নয়। প্রতিবছরই পালিত হয়ে আসা এই উৎসবটি স্থানীয় ঐতিহ্যেরই অংশ।

মাছ ধরার তৃতীয় দিনে প্রথম ঝাপে মাছ শিকারী কটারকোনার মনির মিয়ার জালে ধরা পড়ে বিরল প্রজাতির প্রায় ৩ কেজি ওজনের একটি আইড় মাছ, দুই কেজি ওজনের কালিয়া বাউশসহ ছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ।

সৌখিন মাছ শিকারী আছকর মিয়া, সিপার মিয়া, রেজান মিয়া, আজিম উদ্দিন বলেন, আমাদের অনেকরেই জালে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরা পড়েছে। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার কম মাছ জালে ধরা পড়েছে। কারণ নদীতে মাছের উৎপাদন কমেছে। নদীর উজানে ভারতের অংশে বিষপ্রয়োগের কারণে মাছ মারা যাওয়ার কারনে নদীর মাছ দিন দিন কমছে।

তিনদিনে মনু, গাজীপুর, মাহতাবপুর, লালবাগ, কটারকোনা ও ছৈদল বাজার ঢহর এলাকা পর্যন্ত সহস্রাধিক মাছ শিকারী অংশগ্রহণ ও উৎসুক জনতার পদচারণায় মিলনমেলায় পরিণত হয়। প্রচন্ড শীতের মাঝেও উৎসবের আমেজ তখন নদীর দুই পাড়ে।

কমলগঞ্জের ভানুগাছ থেকে আসা সৌখিন শিকারী আব্দুল মতিন জানান, তিন পেশায় একজন ব্যবসায়ী। শখের বসে বিভিন্ন স্থানে বড়শী ও জাল দিয়ে মাছ শিকার করেন তিনি। গত দেড় যুগ থেকে প্রতিবছর মনু নদের হাট বাওয়ায় মাছ শিকারে আসেন।

হাজীপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা সাইফুল আলম বলেন, আমাদের পূর্ব পুরুষদের সময়কাল থেকে এই নদী থেকে এভাবে উৎসবের মধ্যে দিয়ে মাছ ধরা হয়। বিশেষ করে ২০ ভাগ জেলে ও ৮০ ভাগ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সৌখিন মানুষ এই উৎসবে মাছ শিকার করতে আসেন। মনু নদের কুলাউড়া অংশের ৮ থেকে ১০ টি ঢহরে ‘হাট বাওয়া’ উৎসবের আয়োজন করা হয়।

হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওয়াদুদ বক্স বলেন, যারা নদীতে ‘মাছ ধরা উৎসবে’ নেমেছেন তারা কেউই পেশাদার জেলে নয়। নানা পেশার মানুষ শখের বসে তিন দিনের এই মাছ ধরা উৎসবে নদীতে নেমেছেন। প্রতি শীত মৌসুম আসলেই একই সময়ে নদীর পানি কমে যায়। তখন হাজিপুর, টিলাগাঁও, পৃথিমপাশা ও শরীফপুরে চারটি ইউনিয়ন ছাড়াও বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রায় হাজার খানেক মানুষ মাছ ধরা উৎসবে মেতে ওঠেন। মনু নদীতে মাছ ধরা উৎসব এই এলাকার লোকজনদের দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহ্য হিসাবে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদীর একটি হলো মনু। কুলাউড়ায় এ নদীতে প্রতিবছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে মাছ ধরা উৎসব হয়ে থাকে। এটি মূলত মাছ ধরা উৎসব হলেও এলাকাবাসীর মুখে মুখে এর নাম হয়েছে ‘হাট বাওয়া উৎসব’। তবে কি কারণে হাট উৎসব তার সঠিক ইতিহাস নেই। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিবছরের শুষ্ক মৌসুমে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে নির্দিষ্ট তিন দিন এতদ অঞ্চলের লোকজন একত্রে মাছ ধরা উৎসবে মেতে উঠেন। বহুকাল ধরে এটি চলে আসছে তাই এটি এই এলাকার ঐতিহ্যের একটি অংশ হিসেবে রুপ নিয়েছে।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন