ডার্ক মোড
Tuesday, 29 September 2026
ePaper   
Logo
সিডিএ'র নিয়োগে অনিয়মের তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হননি মূল অভিযুক্তরা

সিডিএ'র নিয়োগে অনিয়মের তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হননি মূল অভিযুক্তরা

এম আর আমিন, চট্টগ্রাম 
 
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বিতর্কিত নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হননি মূল অভিযুক্তরা। 
 
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তে এসে একের পর এক প্রশ্ন সামনে এলেও সেগুলোর সন্তোষজনক জবাব দিতে পারছে না সংস্থাটি। তদন্ত কমিটির সামনে অভিযোগের মূল বিষয়গুলো নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে না পারার পাশাপাশি যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ উঠেছে, সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম ও সাবেক সচিব রবীন্দ্র চাকমাও কমিটির সামনে উপস্থিত হননি।
 
 
বিশেষ সৃত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে শুরু হওয়া নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শুরু থেকে উচ্চ আদালতে মামলা, মামলা চলমান বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতে বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত, মন্ত্রণালয়ে শ্রমিক নেতার লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত করে ৭ কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার মন্ত্রণালয়ের আদেশ অমান্য করে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান, লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সিডিএ ভবনে শুনানি করতে এসে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে কমিটির কিছু কর্মকান্ড রহস্যজনক মনে হওয়ায় সঠিক প্রতিবেদন দেওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন অভিযোগকারীরা। এসময় উপন্থিত ছিলেন, তদন্ত কমিটির আহবায়ক এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্নসচিব মিজ্ ফৌজিয়া খান, কমিটির সদস্য উপসচিব মিজ্ তাসমিন ফারহানা ও কমিটির সদস্য সচিব এবং সিনিয়র সহাকারী সচিব মিজ্ আম্বিয়া সুলতানা, সিডিএ’র পক্ষে ছিলেন, চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, সচিব নূর এ জান্নাত রুমী, সহকারী সচিব মো. আলমগীর খান (বিচারাধীন অস্ত্র মামলায় চার্জশীটভুক্ত আসামী)। 
 
 
এবিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্মচারী ইউনিয়নের (রেজি নং চট্ট- ২৪৯৫) সাধারণ সম্পাদক ও অভিযোগকারী হাবিবুর রহমান বলেন, প্রবেশ পত্রে চউক  সচিবের স্বাক্ষরের নিচে তারিখ লেখার নিয়ম থাকলেও লেখা হয়নি। কারণ সাধারণত ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ আগে ডাক যোগে প্রবেশপত্র প্রেরণের প্রচলিত নিয়ম ভাঙা হয়েছে, পরীক্ষার আগের দিনও প্রবেশপত্র দেওয়া হয়েছে। যাতে অনিয়মের প্রমাণ খুঁজে না পায় সেজন্য তারিখ দেওয়া হয়নি। এবিষয়ে স্বাক্ষরের নিচে তারিখ দেওয়া আইনে বাধ্যতামূলক  কি না তা নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তদন্ত কমিটির আহবায়ক। তালিকা না করেই অপেক্ষামান তালিকার বরাত দিয়ে ৯ জনকে নিয়োগ দেওয়া বেআইনি দাবী করে তা বাতিল করার কথা জানালে তদন্ত টিম চউক কর্মকর্তাদেরকে তালিকা দেখাতে বললেও চউক এর সহকারী সচিব আলমগীর খান,  সেকশন অফিসার মাইনুদ্দিন ও আবদুল হান্নান দেখাতে পারেনি এবং অপেক্ষামান তালিকা তৈরি করা হয়নি বলে জানান। পদোন্নতির জন্য গ্রেডেশন লিস্ট তৈরী হয় ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি কিন্তু  এর আগেই অর্থাৎ ৮ ফেব্রুয়ারি তা বোর্ড সভায় অনুমোদন ও সুপারিশ করেন আর অফিস আদেশ জারি হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি। তাছাড়া ৯ জানুয়ারির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রতি পদের বিপরীতে ১:৫ হিসেবে ভাইভা পরীক্ষার জন্য  উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নাম ও রোল নম্বর ঘোষণা করা হলেও পরবর্তী ১৭ জানুয়ারির পরীক্ষা সহ অন্যান্য তারিখের পরীক্ষার ফলাফলের ক্ষেত্রে ঐ নীতি  অনুসরণ করা হয়নি। তাহাছাড়া, সার্ভেয়ার পদে ২ জনকে এবং  পরিছন্নতা কর্মী ১১ জনকে মৌখিক পরীক্ষায় ডেকে তাদেরকে কোন আইন ও বিধি অনুসারে  নিয়োগ দেওয়া হয়েছে? প্রক্সি দেওয়া প্রার্থী মো. নোমান আলী ও মোহাম্মদ বিপুল এবং কাটাছেড়া আবেদন বাতিল না করে কেন ইয়াছমিন আক্তারকে পরিছন্নতাকর্মী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে? দুইজন সহকারী প্রকৌশলীকে কেন বিলম্বে নিয়োগ পত্র দেওয়া হয়েছে? হাইকোর্টে বিচারাধীন মামলা থাকা সত্বেও কেন নিয়োগ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হল। ৩১ টি পদে ১১৫ জন কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেওয়া হলেও বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয়ে ৯২ জনের নিয়োগ পত্র জারী করা হলেও ৭৫ জন কর্মরত আছে।  চেয়ারম্যান, সচিব ও  চউক কর্মকর্তাগণ ৭৫ জনকে নিয়োগ দিতে গিয়ে আইন ও বিধি মোতাবেক ২৫-২৬ অর্থবছরে বছরে  বাজেটে  অর্থ বরাদ্দ  না থাকা সত্ত্বেও রাজস্ব একাউন্ট থেকে কিভাবে ৭৩ লক্ষ টাকা খরচ করা হয়েছে।
 
 
 এসব বিষয়ে চউক প্রতিনিধি কোন সদুত্তর দিতে পারেনি। বারবার কাগজ-পত্র ও ব্যাখ্য চাইলেও কোন ব্যাখ্যা দেননি চউক, এমনকি চাহিতমতে কাগজ পত্রও সরবরাহ করতে পারেনি। ফলে এসব নিয়োগকে অনৈতিক দাবি করে তা বাতিলের দাবি জানান তিনি। 
 
 
এবিষয়ে আরেক অভিযোগকারী ও নিয়োগপ্রার্থী মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, নিয়োগে যে অনিয়ম হয়েছে এটা পানির মতো পরিস্কার, চাহিত শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকায় বোর্ড সভার সিদ্ধান্তে সম্প্রতি ৮ জন ইমারত পরিদর্শককে অব্যাহতি দিয়েছে সিডিএ, এটাতো আর অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাকে ইচ্ছে করেই ফেল করানো হয়েছে। আমি খাতা দেখানোর জন্য আবেদন করেছিলাম কিন্তু অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার ভয়ে আমাকে খাতা দেখায়নি। সিডিএ’র ইতিহাসে এবার রেকর্ড পরিমান টাকা ব্যয় করেছে এই নিয়োগে।
 
 
 আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি এবারও কোন ব্যবস্থা হবে না। কারণ তদন্ত কমিটি বায়াস্ট হয়ে গেছে। তাঁরা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নবাণে অভিযোগকারীদের নাজেহাল করতে অপরাধীর পক্ষেই কথা বলছে। তবে আমরা আশাবাদী, কারণ দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কোন অনিয়ম সহ্য করবেন না বলে আমরা বিশ্বাস করি। এই কমিটি বায়াস্ট হলে তিনি কিছু একটা করবেন বলে আশা করছি।  
 
 
 
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহাকারী সচিব এবং তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব মিজ্ আম্বিয়া সুলতানা বলেন, আমরা কারো পক্ষ নিয়ে কথা বলিনি। যুক্তি তর্কের মাধ্যমে সত্য উৎঘাটনের চেষ্টা করেছি। অভিযোগকারীদের মাঝে কোন ইনটেনশন আছে কিনা তা বুঝার চেষ্টা করেছি। 
 
 
তদন্তে কোন গাফিলতি হবে না, সঠিক প্রতিবেদন দেওয়া হবে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা উপস্থিত ছিলেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা উপস্থিত ছিলেন না তবে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ে গিয়ে হাজিরা দিবেন বলে জানানো হয়েছে।
 
 
 
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর ৩১টি পদে ১১৫ জন কর্মচারি নিয়োগের জন্য স্থানীয় একাধিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত জনবল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির প্রেক্ষিতে নিয়োগ প্রার্থীদের আবেদনপত্র সমমূহ যাচাই-বাছাই সহ নিয়োগ পরীক্ষা, ব্যবহারিক পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ পূর্বক নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য গঠিত নিয়োগ কমিটির কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ে সংঘটিত অনিয়ম দুর্নীতি সংক্রান্ত সংবাদ একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। হাবিবুর রহমানের আরেকটি আবেদনের প্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি করে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল, কিন্তু তৎকালীন চেয়ারম্যান তা না করে লোভনীয় নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রেখেছিল এবং অদ্যাবধি সেই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। 
 
 
এর আগে গতবছরের ২ এপ্রিল তদন্ত কমিটি চউক ভবনে আসার কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে পরে তা বাতিল হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আরেকটি আবেদন করেন তিনি। এছাড়াও নিয়োগ কার্যক্রম বাতিলের জন্য ২৩ অক্টোবর চউক জাতীয়তাবাদী কর্মচারীদল (রেজি: নং-২৯৪৯) লিখিত আবেদন করেন।
 
 
২০২৫ সালের ৩ জুলাই অনুষ্ঠিত চউক এর ৪৬৫ তম বোর্ড সভার ১১ নম্বর এজেন্ডার উপর আদালতে বিচারাধীন মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে ‘আদালতে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের আইনগত কোন সুযোগ নেই। আদালতের মামলা রায়ের আলোকে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হইবে মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। 
 
 
 
 

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন