ডার্ক মোড
Monday, 02 November 2026
ePaper   
Logo
মন্তব্য প্রতিবেদন :  এইচএসসি পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়: দায়ী কে ?

মন্তব্য প্রতিবেদন : এইচএসসি পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়: দায়ী কে ?

হেমায়েত হোসেন


চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফল দেশের শিক্ষাঙ্গনে এক নজিরবিহীন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

এ বছর পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে আশঙ্কাজনকহারে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা এবং বেড়েছে শূন্য পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। করোনাকালীন বিভিন্ন ছাড়, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও অটোপাসের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে যখন একটি নিরপেক্ষ ও কঠোর মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হয়েছে, তখনই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এই নগ্ন চিত্রটি সামনে চলে এসেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, এই ফল বিপর্যয়ের জন্য মূলত কে দায়ী—শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা, নাকি দীর্ঘদিনের জমে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থার সংকট ?

ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, এবারের বিপর্যয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা। দেশের অধিকাংশ কলেজেই অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের পদ শূন্য পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। অনেক প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের তীব্র ঘাটতি রয়েছে।

বিগত বছরগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত দলীয়করণ ও রাজনৈতিকীকরণের কারণে শিক্ষক সমাজ মূল পাঠদান থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত উপস্থিতির হার তলানিতে ঠেকেছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন ১৩ জেলার মধ্যে সাতটিতেই পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়া এবং মানবিক বিভাগে প্রায় ৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর অনুত্তীর্ণ হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, প্রান্তিক ও সাধারণ মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদানের মান কতটা শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।

অন্যদিকে, এই সংকটের দায় সম্পূর্ণভাবে কর্তৃপক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও যুক্তিসংগত নয়। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি উদাসীনতা এবং ক্লাসমুখী না হওয়ার প্রবণতাও ফল বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে সহজ মূল্যায়ন ও নম্বরে কৃত্রিম স্ফীতির কারণে শিক্ষার্থীরা গভীর পড়াশোনা ও প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। ইংরেজি ও আইসিটির মতো মৌলিক ও ব্যবহারিক বিষয়ে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ফেল করার পরিসংখ্যান সেই ভিত্তিমূলের দুর্বলতাই প্রকাশ করে।

অবশ্য এই বিপর্যয়ের ইতিবাচক দিক হলো, এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ক্ষতগুলোকে কোনো রাখঢাক ছাড়াই উন্মোচন করেছে। শহরাঞ্চলের নামী-দামি কলেজ ও ক্যাডেট কলেজগুলো যখন শতভাগ বা প্রায় শতভাগ সাফল্য ধরে রাখছে, তখন সাধারণ ও মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নাজুক দশা পরিষ্কার হয়ে উঠেছে।

এটি স্পষ্ট যে, মানের এই আকাশচুম্বী বৈষম্য দূর না করলে সমতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব।
সংকট উত্তরণে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে কিছু সময়োপযোগী উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য ৪ লাখ ২২ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর মূল্যবান একটি বছর ঝরে পড়া রোধ করতে এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার ব্যবস্থা করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

একই সঙ্গে ফল পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ এবং খাতা মূল্যায়নে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা ইতিবাচক বার্তা দেয়।
তবে স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। শিক্ষার গুণগত মান ফেরাতে হলে সবার আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক সংকট দূর করতে হবে, প্রশাসনিক পদগুলো দ্রুত পূরণ করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। কেবল পাসের হার বা জিপিএ বাড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করে প্রকৃত শিখন দক্ষতা অর্জনকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি।

এবারের ফল বিপর্যয়কে একটি 'জেগে ওঠার বার্তা' হিসেবে নিয়ে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর সময় এখনই।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন