লালমনিরহাটের রেলওয়ের বাণিজ্য এবং বদলে যাওয়া সীমান্তের ইতিহাস ও ঐতিহ্য
মোঃ লাভলু শেখ লালমনিরহাট।
লালমনিরহাটের রেলওয়ের বাণিজ্য এবং বদলে যাওয়া সীমান্তের ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
একসময় ট্রেনের বাঁশি কেবল একটি যাত্রার ডাক ছিলো না। উত্তরান্চলের মানুষের কাছে তা ছিলো নতুন পৃথিবীর হাতছানি। ধোঁয়া উড়িয়ে ছুটে চলা বাষ্পীয় ইঞ্জিন। লোহার চাকায় ছন্দ তুলে এগিয়ে চলা ট্রেন আর স্টেশনে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়। এসবের মধ্য দিয়ে বদলে গেছে, একটি জনপদের জীবনমান। আজকের লালমনিরহাটকে বাংলাদেশের একটি সীমান্ত জেলা হিসেবে সকলেই জানেন। কিন্তু একসময় ওই শহর ছিল উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রেল যোগাযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। লালমনিরহাট জংশনকে কেন্দ্র করে রেলপথ ছড়িয়ে পড়েছিল রংপুর, পার্বতীপুর, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং ও আসামের দিকে। দেশভাগের আগে যে রেলপথে মানুষ ও পণ্য সীমান্তের কোনো কাঁটাতার না মেনেই চলাচল করতো৷ ১৯৪৭ এর পর সেই একই রেলপথের বুকেই আঁকা হলো আন্তর্জাতিক সীমারেখা। লালমনিরহাটের রেল-ইতিহাস তাই কেবল রেলওয়ের ইতিহাস নয়। এটি উত্তরান্চলের অর্থনীতি, বাণিজ্য, নগরায়ণ, ঔপনিবেশিক শাসন এবং শেষ পর্যন্ত দেশভাগের ইতিহাসও।
রেল আসার আগের লালমনিরহাট
উনিশ শতকের শেষভাগে লালমনিরহাট ছিল মূলতঃ কৃষি ও নদীনির্ভর জনপদ। তিস্তা, ধরলা, সতিনদী ও অন্যান্য নদী এ অঞ্চলের জীবন ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতো। পণ্য পরিবহন ও মানুষের যাতায়াতের প্রধান অবলম্বন ছিল নৌপথ ও স্থলপথ। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক প্রয়োজন ছিল ভিন্ন। বৃহত্তর উত্তরান্চলের কৃষিপণ্য, বিশেষ করে পাট, গম,ভূর্টা ও অন্যান্য কাঁচামাল দ্রুত পরিবহন করতে হয়৷ একই সঙ্গে চা-বাগানসমৃদ্ধ অঞ্চলকে বৃহত্তর বাণিজ্যিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। রেল সেই প্রয়োজনের সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হয়ে উঠে। রেললাইন নির্মাণের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর উত্তরান্চরের ভূগোল যেন নতুন করে আঁকা হতে থাকে।
১৮৭৯ সালে এ রেলের নতুন অধ্যায়
উত্তরবঙ্গ স্টেট রেলওয়ে ১৮৭৯ সালে পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত মিটারগেজ রেলপথ চালু করা হয়। এরপর কাউনিয়া থেকে ধরলা নদীর দিকে রেলপথ সম্প্রসারিত হয়। পরবর্তী সময়ে এ রেলব্যবস্থা লালমনিরহাটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকেন্দ্রে পরিণত করে। এই সময়ের লালমনিরহাটকে আজকের চোখে কল্পনা করলে ভুল হবে। তখন এখানে আধুনিক শহর ছিল না। ছিল না আজকের প্রশাসনিক কাঠামো। রেলওয়ে ধীরে ধীরে জনপদের নতুন কেন্দ্র তৈরি করছিল। ১৮৯৯ সালে লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশনের নির্মাণকাজ শেষ হয়। পরবর্তী সময়ে রেলকে কেন্দ্র করে এখানকার প্রশাসনিক গুরুত্বও বাড়তে থাকে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯০১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কুলাঘাট থানা বিলুপ্ত করে বর্তমান লালমনিরহাট সদর এলাকার জন্য লালমনিরহাট সদর থানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। অর্থাৎ রেল শুধু লালমনিরহাটে আসেনি। রেল আসার সঙ্গে সঙ্গে লালমনিরহাটও যেন নতুনভাবে জন্ম নিতে শুরু করেছিল।
লালমনিরহাট জংশনঃ- চারদিকে ৪ পথ
১৯ শতকের শেষভাগে লালমনিরহাটের গুরুত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। একদিকে পার্বতীপুর ও উত্তরবঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ৷ অন্যদিকে কোচবিহার ও দুয়ার্সের দিকে রেলপথ
সব মিলিয়ে লালমনিরহাট হয়ে উঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলকেন্দ্র। ১৮৯১ সালে গঠিত Bengal Dooars Railway দুয়ার্স অঞ্চলের রেল যোগাযোগ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ওই রেলপথের অন্যতম লক্ষ্য ছিল পশ্চিম ডুয়ার্সকে উন্মুক্ত করা এবং ক্রমবর্ধমান চা-শিল্প ও বনসম্পদের অর্থনৈতিক ব্যবহার সহজ করা। লালমনিরহাট ওই নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত হয়। ১৯০০ সালের ২০ নভেম্বর ডুয়ার্সকে ভোটমারী থেকে লালমনিরহাট জংশনের সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপিত হয়। এর ফলে লালমনিরহাটের সঙ্গে দুয়ার্স ও উত্তরবঙ্গের বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও সুদৃঢ় হয়। রেললাইন তখন শুধু যাত্রী বহন করতো না। চা, পাট, ধান, কাঠসহ বিভিন্ন পণ্য ওই রেলপথে চলাচল করতো। স্টেশনকে ঘিরে গড়ে উঠতে থাকে বাজার, গুদাম, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা ও কর্মসংস্থান। একটি রেলস্টেশন ধীরে ধীরে একটি শহরের হৃদপিণ্ডে পরিণত হয়েছে।
মোগলহাটঃ- আজ যেখানে নীরবতা
লালমনিরহাটের রেল-ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়গুলোর একটি মোগলহাট রেলওয়ে স্টেশন ও পুলিশ ইমিগ্রেশন । ধরলা নদীর তীরে অবস্থিত ওই সীমান্ত রেলকেন্দ্র একসময় ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মোগলহাট থেকে গিতালদহ হয়ে কোচবিহার ও গোলকগঞ্জের দিকে রেল যোগাযোগ ছিল। পরবর্তীকালে ওই নেটওয়ার্ক আসামের সঙ্গে যুক্ত হয়। মোগলহাট স্টেশনটি ১৮৯৬ সালে চালু হয়েছিল বলে রেল-ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্র থেকে উল্লেখ করা হয়েছে । আজ সেই মোগলহাটে দাঁড়ালে অতীতের সেই ব্যস্ততার সঙ্গে বর্তমানের নীরবতার তীব্র বৈপরীত্য চোখে পড়ে। পুরোনো সেতুর ধ্বংসাবশেষ যেন প্রশ্ন করে। একসময় যে পথ দিয়ে মানুষ, পণ্য ও স্বপ্ন ছুটে যেত, সে পথ আজ কেন থেমে আছে!
আসাম মেইলঃ- লালমনিরহাট হয়ে দূর আসামের পথে
লালমনিরহাটের রেল-গৌরবের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলোর একটি হলো ( Assam Mail)। দেশভাগের আগে সান্তাহার থেকে লালমনিরহাট হয়ে গুয়াহাটি পর্যন্ত চলাচল করতো ওই গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন। লালমনিরহাট তখন ছিল বৃহত্তর পূর্ববঙ্গ ও আসামের মধ্যে রেল যোগাযোগের অন্যতম প্রধান সেতু। একটু কল্পনা করা যাক, সেই সময়ের একটি সকাল কেমন হতো! লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশনে বাষ্পীয় ইঞ্জিন দাঁড়িয়ে ছিলো। প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের ব্যস্ততা। কেউ যাচ্ছে আসামে, কেউ কোচবিহারে, কেউ উত্তরবঙ্গের অন্য শহরে। ব্যবসায়ীর পণ্য উঠছে ট্রেনে, চা-বাগানের পণ্য যাচ্ছে বাজারের দিকে। দূর থেকে ভেসে আসছে ইঞ্জিনের বাঁশি। তখনও ভারত-পাকিস্তান নামে কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্ত নেই। একই রেলপথে মানুষ এক ভূখণ্ড থেকে অন্য ভূখণ্ডে যাচ্ছে। আজ যেসব স্থান আলাদা রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। এখন শুধুই স্মতি। রেল তখন সীমান্তের ভাষা জানতো না।
রেল ও লালমনিরহাটের নগরায়ণ
রেল আসার আগে কোনো জনপদ যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। রেল আসার পর তার গুরুত্ব অনেক গুণ বেড়ে যায়৷ লালমনিরহাট তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। রেলওয়ে শুধু স্টেশন নির্মাণ করেনি। তৈরি করেছে কর্মসংস্থান। স্টেশন মাস্টার, চালক, গার্ড, পয়েন্টসম্যান, কারিগর, প্রকৌশলী, কুলি, ব্যবসায়ীসহ অসংখ্য মানুষের জীবন রেলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। রেলওয়ে কলোনি গড়ে উঠেছে। বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে। নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণি তৈরি হয়েছে। দূরের মানুষ কাজের সন্ধানে এসেছে। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও বেড়েছে। এভাবেই একটি রেলওয়ে স্টেশন ধীরে ধীরে একটি শহরের সামাজিক কাঠামো পাল্টে দিয়েছে। আজকের লালমনিরহাট শহরের বিকাশ বুঝতে গেলে তাই রেলওয়ের ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়ার কোন প্রকার সুযোগ নেই।
দেশভাগঃ-একই রেলপথের মাঝখানে একটি সীমান্ত
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলো। মানচিত্রে একটি রেখা টানা হলো। কিন্তু সেই রেখা কেবল কাগজে আঁকা ছিল না। তা মানুষের জীবনের উপরেও আঁকা হলো। লালমনিরহাট থেকে কোচবিহার, গিতালদহ, গোলকগঞ্জ, আসাম যে, রেলপথে অবাধ যোগাযোগ ছিল। সেখানে হঠাৎ রাষ্ট্রীয় সীমান্ত এসে দাঁড়াল। একই রেললাইন ২ দেশের হয়ে গেল। যে ট্রেন গতকাল পর্যন্ত কোনো পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই চলতো। পরদিন তাকে আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিয়ম মানতে হলো। বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলো। বহু পুরোনো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। মোগলহাট ও গিতালদহ রেলপথের ইতিহাস ওই বিভাজনের অন্যতম প্রতীক। দেশভাগের আগে লালমনিরহাট ছিল সংযোগের কেন্দ্রঃ- দেশভাগের পরে সেটিই হয়ে উঠল সীমান্তের প্রান্ত।
রেলপথ হারাল, কিন্তু স্মৃতি হারাল না এখন ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করছে।
দেশভাগের পরও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পুরোনো নেটওয়ার্ক আর আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি। মোগলহাটের পরিত্যক্ত রেলপথ, ধরলার পুরোনো সেতুর ধ্বংসাবশেষ কিংবা লালমনিরহাটের পুরোনো রেলওয়ে স্থাপনা আজ সেই হারিয়ে যাওয়া যুগের সাক্ষ্য বহন করছে। তবু লালমনিরহাটের রেল পুরোপুরি অতীত হয়ে যায়নি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রেলওয়ের উত্তরাঞ্চলীয় নেটওয়ার্কে লালমনিরহাট গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখছে। ২০০৪ সালে ঢাকা ও লালমনিরহাট সরাসরি মিটারগেজ ট্রেন যোগাযোগ চালু করা হয়৷ বর্তমানে লালমনিরহাট জংশন থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু একসময় যে আন্তর্জাতিক ও আন্তঃআঞ্চলিক রেল নেটওয়ার্কের কেন্দ্র ছিল ওই শহর, তার তুলনায় বর্তমান সংযোগ অনেক সীমিত।
একটি সম্ভাবনার গল্প
লালমনিরহাটের রেল-ইতিহাস আমাদের সামনে একটি প্রশ্নও রেখে যায়। যে শহর একসময় উত্তরবঙ্গ ও আসামের মধ্যে অন্যতম প্রধান রেলসেতু ছিল। তাকে কি আবার আঞ্চলিক রেল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায় না? লালমনিরহাটের ভৌগোলিক অবস্থান এখনও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, অন্যদিকে ভারতের কোচবিহার ও আসাম, কাছেই ভুটান। ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের নতুন যুগে পুরোনো রেল-ঐতিহ্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে মোগলহাট ও গিতালদহের মতো ঐতিহাসিক রেল সংযোগ পুনরুজ্জীবিত হলে তা শুধু দুটি রেলস্টেশনকে যুক্ত করবে না৷ যুক্ত করবে একসময়ের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক যোগাযোগ-ভূগোলকে। পরিশেষে, রেলের বাঁশিতে ফিরে আসে ইতিহাস
লালমনিরহাটের রেলস্টেশনে আজও যখন ট্রেন ঢোকে, তখন হয়তো আমরা শুধু একটি ট্রেনের আগমন দেখি। কিন্তু একটু মন দিয়ে শুনলে সেই বাঁশির মধ্যে শোনা যায় একশ বছরেরও বেশি পুরোনো এক জনপদের গল্প। শোনা যায় বাষ্পীয় ইঞ্জিনের শব্দ। শোনা যায় (Assam Mail)এর চাকার ছন্দ। শোনা যায়, মোগলহাটের ব্যস্ত প্ল্যাটফর্ম। শোনা যায়, কোচবিহার থেকে আসা মানুষের কথাবার্তা। আবার শোনা যায় ১৯৪৭ এর হঠাৎ থেমে যাওয়া সেই রেলপথের দীর্ঘশ্বাস। লালমনিরহাটের রেল তাই কেবল লোহার দুটি সমান্তরাল রেখা নয়। এটি একসময় মানুষের সঙ্গে মানুষকে, বাজারের সঙ্গে বাজারকে, উত্তরবঙ্গের সঙ্গে আসামকে এবং একটি জনপদকে বৃহত্তর উপমহাদেশের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। মানচিত্র বদলেছে। রাষ্ট্র বদলেছে। সীমান্ত বদলেছে। কিন্তু রেলের স্মৃতি থেকে গেছে। আর সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়! রেলপথ কখনো শুধু দূরত্ব কমায় না। কখনো কখনো ইতিহাসকেও কাছে নিয়ে আসে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ও সীমান্তে লালমনিরহাটসহ বৃহত্তর উত্তরান্চরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য কে জীবন্ত রাখতে। আবারও চালু করতে। সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছে, সচেতনমহল।
মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন
আপনি ও পছন্দ করতে পারেন
সর্বশেষ
জনপ্রিয়
আর্কাইভ!
অনুগ্রহ করে একটি তারিখ নির্বাচন করুন!
দাখিল করুন

