ডার্ক মোড
Friday, 03 July 2026
ePaper   
Logo
জামালপুর ডায়াবেটিস জেনারেল হাসপাতালে ‘লুটপাটের রাজত্ব’: গঠনতন্ত্র উধাও, ফ্রি সেবার নামে পকেট কাটা ও কোটি টাকার আর্থিক হরিলুট!

জামালপুর ডায়াবেটিস জেনারেল হাসপাতালে ‘লুটপাটের রাজত্ব’: গঠনতন্ত্র উধাও, ফ্রি সেবার নামে পকেট কাটা ও কোটি টাকার আর্থিক হরিলুট!

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, জামালপুর

‎একটি জনকল্যাণমুখী চিকিৎসালয় কীভাবে ব্যক্তিস্বার্থ ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জামালপুর ডায়াবেটিস জেনারেল হাসপাতাল। বছরের পর বছর ধরে এখানে চলছে নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ড, সরকারি নির্দেশনার লঙ্ঘন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রোগীদের ওপর শোষণ। হাসপাতালের সাধারণ সম্পাদকের একক আধিপত্য, আর্থিক অস্বচ্ছতা এবং স্টোর সেকশনের ‘দুর্নীতি মহোৎসব’ প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

‎অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব অপরাধের চিত্র।

‎১. গঠনতন্ত্রের ‘খুন’: বিশ বছর ধরে সিংহাসনে সাধারণ সম্পাদক

‎প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত মূল গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কমিটির মেয়াদ ২ বছর নির্ধারণ করা থাকলেও পরবর্তীতে তা জোরপূর্বক ৩ বছর করা হয়। ক্ষমতার লোভ এতটাই তীব্র যে, বিগত দিনে অন্তত ৫ থেকে ৬ বার গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করা হয়েছে। সর্বশেষ সাধারণ সম্পাদক নিজেই নিজের ইচ্ছামতো গঠনতন্ত্র সংশোধন করে নিয়েছেন।

‎আইনি লঙ্ঘন: মূল গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট উল্লেখ আছে—সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদে কেউ পরপর দুই মেয়াদের বেশি থাকতে পারবেন না। কিন্তু বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নানা নোংরা কৌশল অবলম্বন করে বিগত ২০ বছর ধরে পদটি আঁকড়ে ধরে আছেন, যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত ও গঠনতন্ত্র বিরোধী অপরাধ।

‎২. ভুয়া অডিট ও আর্থিক অস্বচ্ছতার ‘কালো গহ্বর’

‎হাসপাতালের প্রতিদিনের আয়-ব্যয় একটি সুনির্দিষ্ট রেজিস্ট্রি খাতায় অন্তর্ভুক্ত করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। সরকারি বা বেসরকারি কোনো অনুমোদিত অডিট প্রতিষ্ঠান (CA Firm) দিয়ে কখনো অডিট করানো হয় না।

‎পরিবর্তে, সাধারণ সম্পাদক এবং হিসাবরক্ষক তাদের নিজস্ব ও বিশ্বস্ত একজন ব্যক্তিকে দিয়ে লোকদেখানো ‘পকেট অডিট’ করান। সরকারি-বেসরকারি এবং ব্যক্তিগত খাত থেকে অনুদান হিসেবে প্রাপ্ত লাখ লাখ টাকা এবং বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রীর কোনো সঠিক হিসাব বা যথার্থ ব্যবহার নেই। এই অর্থ সরাসরি লোপাট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

‎৩. সমাজসেবা অধিদপ্তরের চুক্তি লঙ্ঘন:


ফ্রি সেবার নামে প্রতারণা

‎সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাথে এই হাসপাতালের লিখিত চুক্তি রয়েছে যে, আগত রোগীদের মধ্যে ২৫% থেকে ৩০% রোগীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (ফ্রি) চিকিৎসা দিতে হবে।

‎বাস্তব চিত্র: কোনো রোগীকে ফ্রি দেখা তো দূরের কথা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা ওষুধ—কোনো কিছুই ফ্রি দেওয়া হয় না।

‎সাধারণ সম্পাদকের দাম্ভিকতা: সাধারণ সম্পাদক প্রায়ই ওপেনলি বলেন, "আমরা বাডাসের ( বাংলাদেশ ডায়াবেটিক এসোসিয়েশন) নিয়ম অনুযায়ী হাসপাতাল চালাই।" বাস্তবে যা ভিন্ন।

‎ডায়াবেটিক রোগীদের সেবার উদ্দেশ্যে এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হলেও এখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ বাণিজ্যিক ও বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর সমপরিমাণ, অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি।

‎ভোক্তা অধিকার ক্ষুণ্ন: কম বার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে সাধারণ রোগীদের কাছ থেকে বেসরকারি ক্লিনিকের সমপরিমাণ বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

‎৪. ‘ভুয়া’ কনসালটেন্ট ও একই প্রতিষ্ঠানে বৈকালিক বাণিজ্যের অবৈধ সিন্ডিকেট

‎হাসপাতালের বর্তমান পরিচালকের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। তিনি নিজেকে ‘হেমাটোলজির কনসালটেন্ট’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে রোগী দেখছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় উচ্চতর ডিগ্রি (যেমন: MD, FCPS ইত্যাদি) ছাড়া কেউ নামের পাশে ‘কনসালটেন্ট’ লিখতে পারেন না। তার এই ডিগ্রি আদৌ আছে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।

‎তাছাড়া, প্রতিষ্ঠানের পূর্ণকালীন বেতনভুক্ত কর্মকর্তা হয়েও তিনি একই হাসপাতালে বৈকালিক চেম্বার খুলে বসেছেন এবং মোটা অঙ্কের ভিজিট নিচ্ছেন। সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার তোয়াক্কা না করে পরিচালকের এই ‘ডাবল পকেট’ বাণিজ্য সম্পূর্ণ বেআইনি।

‎৫. স্টোর সেকশনে ‘ক্রয় জালিয়াতি ও চুরির মহোৎসব’

‎হাসপাতালের স্টোর সেকশনে চলছে হরিলুট। কেনাকাটার জন্য কোনো সক্রিয় ‘ক্রয় কমিটি’ নেই, ফলে কোনো তদারকিও নেই।

‎নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো কেনাকাটায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে কোটেশন (Quotation) নেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয় না। অধিকাংশ কেনাকাটার বিপরীতে কোনো পাকা ক্রয় রসিদ (Cash Memo/Invoice) নেই। সাদা কাগজে ভুয়া হিসাব লিখে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করছে স্টোর ও সাধারণ সম্পাদকের সিন্ডিকেট।

‎৬. কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর মানসিক নির্যাতন ও বৈষম্য

‎হাসপাতালটিতে চলছে ‘দাস প্রথা’র আধুনিক রূপ। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোতে চরম বৈষম্য। যোগ্যতা নয়, বরং সাধারণ সম্পাদকের ‘আশীর্বাদ’ হওয়াই এখানে টিকে থাকার একমাত্র মাপকাঠি।

‎সাধারণ সম্পাদকের চামচামি করলে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা আকাশচুম্বী হয়। বিপরীতে, যারা সৎ ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করেন, তারা প্রতিনিয়ত অপমান, ভর্ৎসনা এবং চাকরিচ্যুতির হুমকির শিকার হচ্ছেন।

‎প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ ও তদন্তের দাবি

‎জামালপুর ডায়াবেটিকস জেনারেল হাসপাতালটি কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি একটি জনকল্যাণমুখী সামাজিক প্রতিষ্ঠান। জেলা সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসক (DC) এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম খতিয়ে দেখা। এই অপরাধমূলক সিন্ডিকেট ভেঙে হাসপাতালটিকে সাধারণ মানুষের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ও কার্যকরী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের তীব্র দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে।

 

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন

আপনি ও পছন্দ করতে পারেন