সিলেটে রাজনৈতিক মামলা বানিজ্য চরমে আসামি হচ্ছেন নিরীহ মানুষ
সিলেট ব্যুরো
সিলেটে রাজনৈতিক মামলা বানিজ্য চরমে দাড়িয়েছে। বেশির ভাগ আসামি হচ্ছেন নিরীহ মানুষ। বিএনপি দলীয় নেতাকর্মী,সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরাও আসামি হচ্ছেন। মগের মুল্লুকের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে,শত শত,হাজার হাজার মানুষকে আসামি করে একের পর এক মামলায় অতিষ্ঠ করে তুলেছে একটি চক্র। নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগের শেষ নেই।
সিলেটে দায়ের করা মামলা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। এসব মামলায় অনেক নির্দোষ ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে। বাদ যাচ্ছেন না সাংবাদিকরাও। কেউ কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত না থাকার পরও একের পর এক যোগাযোগী হয়রানি মূলক মামলায় মৃত্যুর পথও বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছেন! এসবের জন্য প্রতিকার চাওয়ার মতো যেন কেউ নেই,এমনকি বিএনপি দলীয় নেতাকর্মীদেরও আসামি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ব্যক্তি আক্রোশের কারণে মামলায় আসামি করা হচ্ছে।
মামলার অভিযোগ উঠেছে, মামলা দায়ের নিয়ে বাণিজ্যেও নেমেছে কেউ কেউ। লক্ষ-লক্ষ টাকা বাণিজ্য করে কেউ কেউ ইতিমধ্যে কোটি টাকাও কামিয়ে নিয়েছেন। মামলায় ঢুকানো,নাম কর্তন করা থেকে শুরু করে কত রকমের ইতিহাস সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। ফলে বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছেন সিলেট বিএনপি’র নেতারা। তারা জানিয়েছেন, কেউ আক্রান্ত হলে মামলা দিতে পারেন। কিন্তু এই মামলা নিয়ে বিএনপি’র সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ নিলে কোনো বিতর্ক থাকবে না। এ কারণে মামলা দায়েরকারী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের নিজ-নিজ ইউনিটের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করার তাগিদ দেয়া হয়েছে।
গত ৫ই আগস্ট২৪ইং শেখ হাসিনার সরকারের পতনের দিন পর্যন্ত সিলেটে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও হত্যাকান্ডের মতো ঘটনা ঘটেছে। অনেকেই আহত হয়ে হাসপাতালে ছিলেন। এখন সুস্থ হয়ে এসে মামলা দায়ের করছেন।
ইতিমধ্যে জেলা ও নগর মিলিয়ে বেশামাল মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ সব মামলাঢ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে। মামলায় আসামি করা হয়েছে চ্যানেল আই ও রেডিও টুডে’র সিলেট প্রতিনিধি সাদিকুর রহমান সাকী,সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আল-আজাদ ও সাপ্তাহিক বৈচিত্র্যময় সিলেট পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক আবুল কাশেম রুমন,ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও দৈনিক আলোকিত সিলেট এর চীফ রিপোর্টার কবি নূরুদ্দীন রাসেল সহ মূলধারার অনেক সাংবাদিকদের।
সিলেটের আদালতে সাংবাদিক সাকির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন খোরশেদ আলম ও সাংবাদিক নূরুদ্দীন রাসেল এর বিরুদ্ধে দক্ষিণ সুরমার কাজির খলা গ্রামের জাকির হোসেন দিপু নামের ব্যক্তি ছাড়াও আরো বিভিন্ন বাদী। অথচ মামলার বাদী,সাক্ষীকে তারা কেউ চিনেন না এবং ঘটনা গুলোর সাথেও কোনো সম্পৃক্ততা নেই তারপরও অজানা রহস্যময় ভাবে মামলায় তাদের জড়িয়ে চরম হয়রানি করা হচ্ছে।
নগরের ৫নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি সাদিকুর রহমান সাদিক জানিয়েছেন, এ মামলা দায়েরে ওয়ার্ড বিএনপি’র কেউ সম্পৃক্ত নন। আমরা মামলা সম্পর্কে জানি না। মামলার বাদীকে আমি চিনি না। ২০শে আগস্ট সিলেট জেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জুবের আহমদ বাদী হয়ে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় ৫নং ওয়ার্ডের যুবদলকর্মী রেদোয়ান আহমদকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় তার বড় ভাই আলমাছ আহমদ শুকুরকেও আসামি করা হয়েছে। এছাড়া আরও দু’টি মামলায় আলমাছ আহমদ শুকুরকে আসামি করা হয়।
যুবদল কর্মী রেদোয়ান আহমদ বলেন, তার ভাই শুকুর বিগত ২০১৮ সালে দায়ের করা আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক মামলায় আসামি হয়ে ছিলেন। অথচ এবার তাকে বিএনপি’র মামলার আসামি করা হলো। আর আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখলেও কেবল মাত্র ব্যক্তি আক্রোশে তার ওপর মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। বলেন- তার এক ভাই ওয়ার্ড বিএনপি’র ক্রীড়া সম্পাদক আর পিতা আব্দুস সামাদ ছিলেন বিউবো’র শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক। তাদের গোটা পরিবার বিএনপি ঘরানার হওয়ার পরও তারা এখন আসামি।
স্থানীয় যুবদল নেতা রায়হান আহমদ বলেন, রেদোয়ান যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সে বিগত আন্দোলনেও সক্রিয় ছিল। এছাড়া তার ভাই শুকুর অতীতে আওয়ামী লীগের দায়ের করা দু’টি মামলায় আমাদের সঙ্গে আসামি ছিলন। তাদের পরিবার বিএনপি পরিবার। ব্যক্তি আক্রোশের কারণে তাদের ওপর মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানান তিনি। নগরীর টুকের বাজারের একটি মামলায় সাংবাদিক ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব অলিউর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। এ নিয়ে সাংবাদিক মহলে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এ ব্যাপারে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও নগরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, আন্দোলনে আহত হলে যে কারো মামলা দেওয়ার অধিকার আছে। তবে আমাদের নির্দেশনা হলো যারা প্রকৃত আসামি এবং সন্ত্রাসী তাদেরকে যেন আসামি করা হয়। কোনো নির্দোষ, নিরপরাধ ব্যক্তিকে আসামি করলে দল থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এটি ইতিমধ্যে সিলেট বিএনপি’র সিনিয়র নেতারা দলীয় নেতাকর্মীদের জানিয়ে দিয়েছেন।
এদিকে শেখ হাসিনার সময় আওয়ামী লীগ ও সরকারি বাহিনীর হাতে হত্যাকান্ড ও নির্যাতনের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলা সমূহে কোনো নিরীহ কর্মকর্তা ও ব্যক্তিকে আসামি এবং হয়রানি না করার আহ্বান জানিয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপি’র সভাপতি আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জেলা বিএনপি’র নেতৃবৃন্দ বলেন- যারা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর বর্বর নির্যাতন ও হত্যাকান্ড চালিয়েছে তাদের বিচার অবশ্যই হবে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কোনো অবস্থাতেই যেন কোনো নির্দোষ ব্যক্তি ক্ষতি গ্রস্ত বা হয়রানির শিকার না হন। সিলেট জেলা বিএনপি’র পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা হচ্ছে, কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কারণে কাউকে আসামি করা যাবে না। যদি এই ধরনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় তবে সিলেট জেলা বিএনপি সংশ্লিষ্ট দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার থেকে শুরু করে সরকার পতনের দাবিতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লাগাতার কর্মসূচির সময়টাতে ঘটে যাওয়া সহিংসতা গুলোকে কেন্দ্র করে একের পর এক মামলা হচ্ছে রাজধানীসহ সারা দেশে। অন্তবর্রতী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই দুই মাসে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট হাজারো ব্যক্তির নামে অসংখ্য মামলা হয়ে গেছে এরই মধ্যে, যেখানে শুধু হত্যা মামলাই আছে পাঁচ শতাধিক। এরই মধ্যে অভিযোগ উঠেছে, পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটের ফায়দা লুটতে মামলা বাণিজ্যে মেতেছে কয়েকটি চক্র। আর তাদের মূল টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কর্ণধাররা। মামলায় আসামি না করার শর্তে ব্যবসায়ীদের কাছে দাবি করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। ভুক্তভোগীরা বলছেন, মামলাবাজ ওই চক্রের দাবি না মেটালেই ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে ‘সিরিজ’ মামলায়। শুধু ব্যবসায়ীই নন, বাদ যাচ্ছেন না সাংবাদিক, তারকারা, এমনকি শিক্ষকরাও। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য এবং পূর্বশত্রুতাকে কেন্দ্র করেও মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এমনও ঘটনা ঘটছে, যেখানে মামলার বাদী ও আসামি কেউই কাউকে চেনেন না।
একই ভাবে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিক,ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধেও হত্যা মামলা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ মিলছে। এসব বানোয়াট মামলাকে হাতিয়ার বানিয়ে কোটি- কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কয়েকটি চক্র। এ নিয়ে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে জনমনে। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। অনেকে বাসাবাড়িতেও থাকতে পারছেন না।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারাও ঢালাও মামলার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। গণমাধ্যমকে তারা বলেন, প্রতারক চক্র মামলা-বাণিজ্য করছে, তা সত্য। নিরপরাধ ব্যবসায়ী ও লোকজনদের মামলা দিয়ে হয়রানি করছে বলে বেশ কিছু অভিযোগ এসেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় মামলা নিয়ে প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠার গুরুতর অভিযোগ এসেছে। আইনজীবী পরিচয় দিয়ে কেউ কেউ প্রতারক চক্রদের সহযোগিতা করছে। তাছাড়া প্রতারকদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাদেরও সুসম্পর্ক আছে। সুযোগ পেয়ে তারা মিলেমিশে অপকর্ম চালাচ্ছে। যারা এসব অপকর্ম করছে, তাদের নজরদারির পাশাপাশি আইনের আওতায় আনতে পুলিশের সব ইউনিট প্রধান ও জেলা পুলিশ সুপারদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কোনো মামলার এজাহারে নাম থাকলেই যে গ্রেফতার করতে হবে, আইনে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। তদন্ত শেষে তারপর গ্রেফতারের বিষয়টি আসে। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে না, তাদের নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে। এই বিষয়টি সঠিক ভাবে পরিচালনা করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে মামলা বাণিজ্যের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতার-বাণিজ্যের অভিযোগও পাওয়া গেছে। একাধিক ভুক্তভোগীর দাবি, মামলার আসামিদের ধরতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব অভিযানে নিরপরাধ অনেকে গ্রেফতার ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তাছাড়া অভিযানের নামে গ্রেফতার-বাণিজ্যেরও শিকার হচ্ছেন অনেকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে তালিকা সংগ্রহ করার তথ্যও মিলেছে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Latest News
Vote / Poll
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলা বন্ধ করতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগ যথেষ্ট বলে মনে করেন কি?

