Dark Mode
Saturday, 20 June 2026
ePaper   
Logo
যে কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে ভারতের টিকাদান কর্মসূচি

যে কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে ভারতের টিকাদান কর্মসূচি

বিদেশ ডেস্ক

করোনা টিকা জন্য অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করতে ৩১ বছরের স্নেহা মারাথে-র অর্ধেক দিন লেগেছিল। তার ভাষায়, ‘এটা ছিল কে কত দ্রুত আঙুল চালাতে পারে তার খেলা। সবগুলো স্লট তিন সেকেন্ডেই ভরে গেল।’ কিন্তু শেষ মুহূর্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার নির্ধারিত স্লটটি বাতিল করে দিলো। তাকে জানানো হলো, তাদের কাছে কোনও ভ্যাকসিন নেই। মারাথেকে আবার নতুন করে ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য সময় বুক করার চেষ্টায় নামতে হলো।

ভারতে ১৮ থেকে ৪৪ বছর বয়সী প্রত্যেককে টিকা পাবার জন্য কো-উইন নামে সরকারি ওয়েবসাইটে নাম নথিভুক্ত করাতে হয়। দেশটিতে টিকার চাহিদা এখন ভ্যাকসিনের সরবাহকে ছাপিয়ে গেছে।

প্রযুক্তি বিশারদ ভারতীয়রা এমনকি এখন দুষ্প্রাপ্য এই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাবার কৌশল খুঁজতে মরিয়া হয়ে ইন্টারনেটে সঙ্কেত-কোড উদ্ভাবনের চেষ্টা চালাচ্ছেন।


মারাথে এসব সঙ্কেত জানেন না। তবে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ভারতের যে কয়েক লাখ মানুষ ডিজিটাল জগতের সঙ্গে যুক্ত তিনি তাদের দলে। তবে অন্যদিকে, ভারতে কোটি কোটি মানুষ আছে যাদের না আছে স্মার্টফোন, না আছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ। আর বর্তমানে টিকা পাওয়ার একমাত্র পথ হলো অনলাইনে সময় বুক করা।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রীয় সরকার যখন প্রায় ৯৬ কোটি ভারতীয় নাগরিকের জন্য টিকাদান কর্মসূচির দরজা খুলে দেন, তখন সরকারের হাতে প্রয়োজনের কাছাকাছি পরিমাণ টিকাও ছিল না। ভারতের ৯৬ কোটি মানুষকে পুরো টিকা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ১৮০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন।

আরও শোচনীয় যে, ভারতে যখন কোভিড সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে এবং তৃতীয় আরেকটি ঢেউ আসছে বলে সতর্কবার্তা আসছে, তখনই দেখা গেলো টিকার ব্যাপক ঘাটতি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিবিসিকে বলেছেন, মোদি সরকারের নানা ভুলত্রুটির মিশেল ভারতের টিকাদান কর্মসূচিকে একটা গভীর অসম প্রতিযোগিতায় পরিণত করেছে। এসব ভুলত্রুটির মধ্যে আছে পরিকল্পনার অভাব, খণ্ডিতভাবে ভ্যাকসিন সংগ্রহ এবং টিকার দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা।

যে দেশ দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি টিকা প্রস্তুতকারী, যে দেশকে প্রায়ই বলা হয় সাধারণ ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে ‘বিশ্বের ওষুধ নির্মাতা’, সেই দেশ নিজের জন্য কীভাবে এত কম ভ্যাকসিন তৈরি করতে পারে?

অপরিকল্পিত কৌশল

ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার ওষুধ পাওয়ার ব্যাপারে লবিংকারী একটি সংস্থা অ্যাকসেসআইবিএসএ। সংস্থাটির সমন্বয়কারী আচল প্রোভালা-র ভাষায়, ‘ভারত তার ভ্যাকসিন সংগ্রহের অর্ডার দেওয়ার জন্য জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল। আরও অনেক আগেই দেশটি তার আগাম অর্ডার দিতে পারতো। তারপরও তারা অর্ডার দিয়েছিল খুবই সামান্য পরিমাণ টিকা।’

ভারত ২০২১ সালের জানুয়ারি এবং মে মাসের ভেতর কেনে দুইটি অনুমোদিত টিকার ৩৫ কোটি ডোজ। টিকা দুইটি হচ্ছে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন, যা ভারতে সিরাম ইনস্টিটিউট তৈরি করছে কোভিশিল্ড নামে এবং দেশীয় সংস্থা ভারত বায়োটেকের তৈরি কোভ্যাকসিন। প্রতি ডোজ টিকার জন্য দেওয়া দুই ডলার দাম ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে সুলভ মূল্যের টিকাগুলোর অন্যতম। কিন্তু এই পরিমাণ টিকা দেশটির জনসংখ্যার এমনকি ২০ শতাংশের জন্যও যথেষ্ট ছিল না।

এক পর্যায়ে নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা দেন, ভারতে কোভিড পরাস্ত হয়েছে। এমনকি তিনি ভ্যাকসিন কূটনীতিও শুরু করে দেন। মার্চে ভারতে যত মানুষকে টিকা দেওয়া হয়, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ টিকা তিনি বিদেশে কূটনীতি করতে দান করে দেন।

উল্টো দিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভ্যাকসিন বাজারে আসার প্রায় এক বছর আগেই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ডোজ টিকা আগাম অর্ডার দিয়ে রেখেছিল।

অ্যাকসেসআইবিএসএ-এর সমন্বয়কারী আচল প্রোভালা বলেন, ‘এই টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সরবরাহ ও বিক্রির ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়েছিল। ভ্যাকসিন উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে কোনও কোনও দেশের সরকার যাতে দ্রুত প্রচুর পরিমাণ টিকা হাতে পায় তারও নিশ্চয়তা দিয়েছিল।’

সেখানে ভারত টিকা উৎপাদনে সেরাম ইনস্টিটিউট এবং ভারত বায়োটেককে সহায়তার জন্য ৬১ কোটি ডলার অর্থ সাহায্য অনুমোদন করতে অপেক্ষা করেছে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত। ততদিনে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে।

অল ইন্ডিয়া ড্রাগ অ্যাকশন নেটওয়ার্কের সহ-আহ্বায়ক মালিনী আইসোলা বলছেন, আরেকটি ব্যর্থতা হলো, ভারতে জৈব বিষয় নিয়ে কাজ করে এমন বহু উৎপাদন প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোকে এই উদ্যোগে শামিল করা। তাদের টিকা তৈরির সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের একটি তালিকা তৈরি করে তাদের এই কাজে অনায়াসে লাগানো যেতো।

তিনটি সরকারি মালিকানাধীন সংস্থাসহ চারটি সংস্থাকে সম্প্রতি কোভ্যাকসিন তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কোভ্যাকসিনও তৈরি হচ্ছে আংশিক সরকারি অর্থে। অন্যদিকে, এপ্রিলের গোড়ার দিকে রাশিয়ায় স্পুটনিক ভি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভারতের একটি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করে, যাদের ভারতে এই টিকাটি তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়।

সমন্বয়হীন বাজার

মালিনী আইসোলা বলেন, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার একমাত্র ক্রেতা হিসেবে শুরুতেই টিকার দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে একটা বড় ভূমিকা নিতে পারতো। তার ভাষায়, ‌‘যেহেতু কেন্দ্রীয়ভাবে ভ্যাকসিন কেনা হয়েছিল, সেক্ষেত্রে সরকার টিকার দাম দুই ডলারের নিচে নামিয়ে আনতে পারতো। তার বদলে দাম বেড়ে গেছে।’ এর কারণ, ১ মে থেকে রাজ্যগুলো এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলো প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে দেন-দরবার করছে ।

বিরোধী দলগুলো এটাকে একটা ‘কেলেঙ্কারি’ আখ্যা দিয়েছে। তারা বলছে, কেন্দ্রীয় সরকার তাদের দায়িত্ব ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে রাজ্যগুলোর মধ্যে একটা হতাশাজনক প্রতিযোগিতার দরজা খুলে দিয়েছে।

রাজ্যগুলোকে এখন কেন্দ্রীয় সরকারের কেনা দামের চেয়ে দ্বিগুণ দাম দিতে হচ্ছে কোভিশিল্ডের জন্য আর কোভ্যাকসিনের জন্য আরও বেশি। অর্থাৎ প্রতি ডোজ কোভিশিল্ড তাদের কিনতে হচ্ছে চার ডলার দিয়ে। আর কোভ্যাকসিন প্রতি ডোজ আট ডলার দামে। দুই সংস্থাই বলেছে ‘মানবিক কারণে’ তারা রাজ্যগুলোর জন্য টিকার দাম কমিয়ে দিয়েছে।

রাজ্যগুলোকে একইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়তে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে। টিকার মজুত যেহেতু কম, তাই বেশি দামে যে কিনতে পারবে টিকা সেই পাবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সুবিধা তারা বাড়তি দামটা তুলে নেবে ভোক্তাদের কাছ থেকে।

ফল হয়েছে: বাজার খুলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু চলছে অসম প্রতিযোগিতা। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এক ডোজ ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে দেড় হাজার রুপিতে অর্থাৎ ২০ ডলারে।

বেশ কয়েকটি রাজ্য এখন ফাইজার, মর্ডানা এবং জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা আমদানির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। কিন্তু কোন প্রস্তুতকারকই আগামী কয়েক মাসের মধ্যে টিকা সরবরাহের কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। কারণ ধনী দেশগুলোর আগে দেওয়া অর্ডারের টিকা সরবরাহের ব্যাপারে তারা চুক্তিবদ্ধ। অন্যদিকে রুশ ভ্যাকসিন স্পুটনিক ভি অনুমোদন পেলেও কবে তা বাজারে আসবে তা স্পষ্ট নয়।

ভারতে টিকার দাম কি এতো বেশি হওয়া উচিত?

কেউ কেউ বলছে সেরাম ইনস্টিটিউট এবং ভারত বায়োটেক মহামারির মধ্যে মুনাফা করছে, বিশেষ করে সরকারি অর্থ সাহায্য পাওয়ার পরও। কিন্তু অন্যরা আবার বলছে, এই প্রতিষ্ঠান দুইটি যথেষ্ট পরিমাণ ঝুঁকি নিয়েছিল এবং দোষ সরকারের। ভারত একমাত্র দেশ যেখানে শুধু কেন্দ্রীয় সরকার এককভাবে টিকার ক্রেতা নয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একমত যে, সেরাম এবং ভারত বায়োটেকের উৎপাদন ব্যয় এবং তাদের বাণিজ্যিক চুক্তির বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

আইসোলা বলছেন, সেরামের উচিত আন্তর্জাতিক কোভ্যাক্স প্রকল্প এবং গেটস ফাউন্ডেশন থেকে তারা যে ৩০ কোটি ডলার পেয়েছে সেটা তারা কীভাবে খরচ করেছে তা প্রকাশ করা। এই অর্থ তাদের দেওয়া হয়েছে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য ভ্যাকসিন উৎপাদনের ব্যয় বাবদ। ভারত রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় সেরাম সেই কাজটি করতে ব্যর্থ হয়েছে।

সেরামের মাথার ওপর এখন অ্যাস্ট্রাজেনেকার আইনি নোটিস ঝুলছে। কারণ চুক্তি অনুযায়ী নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সংস্থাটি প্রতিশ্রুত ৫০ শতাংশ টিকা সরবরাহের চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ভারত বায়োটেকের সঙ্গে ভারত সরকারের চুক্তি খুঁটিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ বলেছে, তারাও কোভ্যাকসিনের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বত্ত্বের অংশীদার। কারণ এই টিকা উদ্ভাবনে তারা বায়োটেকের সঙ্গে কাজ করেছে। অথচ এই টিকার দাম কোভিশিল্ডের দ্বিগুণ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. অনন্ত ভান বলছেন, এখন এই স্বত্ত্ব ও প্রযুক্তি নিয়ে আইনি লড়াই মোকাবিলা করে অন্য সংস্থাকে এই টিকা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হবে খুবই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সময় থাকতে এসব বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত ছিল।

ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের ৭০ ভাগকে পুরো ডোজ টিকা দেওয়া একটা দুরূহ ও সময়সাপেক্ষ উদ্যোগ ছিল। ফলে এর জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ধৈর্য্যের প্রয়োজন ছিল। ড. ভান বলছেন, ভারতে ব্যাপক পর্যায়ে টিকাদানের সফল অতীত রেকর্ড রয়েছে। কাজেই এটা অসম্ভব কোনও কাজ ছিল না। তাই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তা হলো, সরকার কেন শুধু দুইটি কোম্পানির ওপর সব আস্থা রেখে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে? এতে করে সরবরাহ ও দামের বিষয়টি এখন পুরোপুরি তাদের হাতে চলে গেছে। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো এখন কেউ নেই।

সূত্র: বিবিসি।

 

Comment / Reply From

You May Also Like

Vote / Poll

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলা বন্ধ করতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগ যথেষ্ট বলে মনে করেন কি?

View Results
হ্যাঁ
0%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%

Archive

Please select a date!