Dark Mode
Sunday, 21 June 2026
ePaper   
Logo
ত্রিপুরার ভূমিপুত্র কৃষ্ণকুসুম পাল : চৌতারা কবিতার রূপকার ও মানবতার প্রহরী

ত্রিপুরার ভূমিপুত্র কৃষ্ণকুসুম পাল : চৌতারা কবিতার রূপকার ও মানবতার প্রহরী


লুতুব আলি

কৃষ্ণকুসুম পাল, ছদ্মনাম কুকুপা। ত্রিপুরার বিলোনিয়ায় ০২/০৭/১৯৫২ তারিখে জন্ম। পিতা মনীন্দ্র কুমার পাল ও মাতা পারুল বালা পাল খুকু রাণীর সন্তান। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গীতিকার, সংগঠক, সম্পাদক এবং অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। সাহিত্য ও সমাজের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এই বহুমুখী প্রতিভা বর্তমানে বাংলা আকাদেমি ত্রিপুরার সচিব, বিলোনিয়া সাহিত্য পরিষদের সভাপতি, ভারতীয় জনলেখক সংঘের সহসভাপতি, আন্তর্জাতিক বাংলাভাষা পরিষদের উপদেষ্টা এবং ত্রিপুরা মানবাধিকার সংঘের জেলাসম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সম্পাদক হিসেবে তিনি দীপসাহিত্য, বিলোনিয়া সাহিত্য পরিষদ, খোলাচিঠি পশ্চিমবঙ্গের ত্রিপুরা রাজ্য শাখা, ভারতীয় দলিত সাহিত্য একাডেমি দিল্লির ত্রিপুরা রাজ্য শাখা এবং বাংলাজননী পত্রিকার দায়িত্বে থেকে নবীন-প্রবীণ লেখকদের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেছেন।

তাঁর যুগান্তকারী সৃষ্টি ‘চৌতারা কবিতা’। দুই পঙ্‌ক্তি ও চারটি শব্দ-জোড়ার মধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ কবিতা, একটি আস্ত জীবনদর্শন ধরা পড়ে। মিতব্যয়ী অথচ গভীর এই কাঠামো সোশ্যাল মিডিয়ার দ্রুত যুগেও পাঠকের হৃদয় জয় করেছে। অণুকাব্যের স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে চৌতারা আজ প্রতিষ্ঠিত। গভীর অনুভব, সুন্দর শব্দচয়ন, অভিনব উপস্থাপনা আর বাস্তব অভিজ্ঞতার সূক্ষ্ম প্রকাশে তাঁর চৌতারা পাঠককে মোহিত করে। চৌতারা প্রসঙ্গে কবি কৃষ্ণকুসুম পাল এই প্রতিবেদককে বলেন, “লিখে যাও তোমার মনের মতো করে। চৌতারা মানে বাঁধন, আবার মুক্তিও। চারটি শব্দ-জোড়ায় জীবনকে ধরতে পারলেই কবিতা হয়।” অল্প শব্দে বিপুল ব্যঞ্জনা এনে এই নতুন ধারা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করছে।

বাংলা শ্লোকে গীতা সহ তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২২টি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: আমার কুমারী মা, বর্ণময় সহমরণ, নীল আকাশ সবুজ পাখী, রাতের কাব্য, রসকষ, সিঁথিতে উজ্জ্বল ছায়াপথ, প্রেম একখরস্রোতা নদী, দিব্যাঙ্গনা দ্রৌপদী, স্বপন মনন অন্তঃকলন, অঃ নাস্তিকের ঈশ্বর, বন্দে বাংলামাতরম্, যীশুর চোখে, তবু প্রেম জীবনরেখা, দিন যায়-কবিতা থাকে, কবিতার মন, নীতিমালিকা, বাংলার পাশে, তীর্থময় বিলোনিয়া, নয়নাভিরাম নীরমহল, প্রত্যক্ষের পিলাক, ছবিরমতো ছবিমুড়া, নির্বাচিত কবিতা ও কৃষ্ণকুসুম সমগ্র।

সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি নিষ্ঠাবান সমাজসেবক। ২০২০ সালের মে মাস থেকে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা দান করে চলেছেন এবং আজীবন এই দান অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছেন। মানবতাবাদী হিসেবে ত্রিপুরা মানবাধিকার সংগঠনের মহকুমা সম্পাদক ও জেলাসম্পাদক পদে থেকে অধিকারবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

বাংলাভাষাকে ধ্রুপদি ভাষার মর্যাদা আদায়ের সংগ্রামে তিনি অগ্রণী। এই লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে পাঁচটি সাহিত্য সংস্থা থেকে ভাষাযোদ্ধা সম্মাননা পদক ও মানপত্র পেয়েছেন। দেশ-বিদেশের অসংখ্য সম্মাননার মধ্যে রয়েছে ভারতীয় দলিত সাহিত্য একাডেমি সম্মাননা, জলস্রী সাহিত্য সংঘ, গিরিধারী সংঘ, মহাবঙ্গ সাহিত্য সংসদ, বঙ্গবন্ধু সাহিত্য সংসদ, সাধনা সাহিত্য সংসদ, ঈশান সাংসদ, স্বর্ণপদক সংঘ, জনলেখক সাহিত্য সংঘ, ভাষাযোদ্ধা সংঘ ঢাকা, ভাষাসৈনিক সংঘ, বরাকবন্ধু সংঘ, মধুসূদন একাডেমি সংঘ, বাণীকলা সংঘ, সমতা সংঘ, কবিরত্ন সংঘ, সাহিত্যসাগর সংঘ, ডঃ বি আর আম্বেদকর নেহ ফেলো, ভগবান বুদ্ধ নেহ ফেং, বিকাশশীল লেখক সংঘ, আর্য সংঘ, জয়স্তী সংঘ, বন্দে মাতরম সংঘ, দীপ সংঘ, স্বাগতম সম্মান, সম্পাদনিক সম্মান, সবুজকন্ঠ সম্মান, দৈনালী সাহিত্য সম্মান, অদ্বৈত সম্মান, কাছাড় সম্মান, ভাষাযোদ্ধা অগ্রণী সম্মান, ভাষাযোদ্ধা সৃষ্টি সম্মান, সৈনালী ভাষা সৈনিক সম্মান, অরণী সম্মান, স্বজন সম্মান, বিদ্যাসাগর সম্মান, সুজন সম্মান, আঃ সমাজ রত্ন সম্মান, মনু থেকে ফেনী সম্মান ও মৈত্রী সম্মান।

প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর নিলেও ত্রিপুরা গণিত পরিষদের প্রাক্তন মহকুমা সম্পাদক হিসেবে তিনি শিক্ষা ও যুক্তিবাদী চর্চার প্রসার ঘটিয়েছেন। সৃষ্টি, সেবা, সংগ্রাম ও মানবতা— এই চার স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণকুসুম পালের জীবন নিজেই এক জীবন্ত চৌতারা, যেখানে প্রতি শব্দে ইতিহাস আর প্রতি পঙ্‌ক্তিতে ত্রিপুরার মাটির গন্ধ লেগে আছে।

Comment / Reply From

You May Also Like

Vote / Poll

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলা বন্ধ করতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগ যথেষ্ট বলে মনে করেন কি?

View Results
হ্যাঁ
0%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%

Archive

Please select a date!