ডার্ক মোড
Sunday, 21 April 2024
ePaper   
Logo
সিসি ব্লক বসানো হয়নি, তবু ২০ কোটি টাকার বিল পরিশোধ

সিসি ব্লক বসানো হয়নি, তবু ২০ কোটি টাকার বিল পরিশোধ

নিজস্ব প্রতিবেদক

পানি উন্নয়ন বোর্ডের চারটি প্রকল্পে নদীভাঙন ঠেকাতে সিসি ব্লক না বসিয়ে প্রায় ২০ কোটি টাকার বিল পরিশোধের অনিয়ম পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া সরকারি তিনটি ড্রেজার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়ার পর কয়েক বছর ধরে ভাড়া আদায় করতে পারছে না সংস্থাটি। এমনকি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ড্রেজারগুলোও ফেরত দিচ্ছে না। আর কোনো কাজ বাস্তবায়ন না করা সত্ত্বেও এক বছরে অনিয়মিত শ্রমিক মজুরি হিসেবে ১ কোটি ৭৫ লাখ পরিশোধ দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের শহর রক্ষা, তীর সংরক্ষণ এবং ড্রেজিং সম্পর্কিত প্রকল্পের ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের কমপ্লায়েন্স অডিট প্রতিবেদনে এসব অনিয়ম তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলীর অধীন তিনটি প্রকল্পে ২০১৯-২০ অর্থবছরে গৃহীত সিসি ব্লকের সংখ্যা অপেক্ষা অধিকসংখ্যক সিসি ব্লকের বিল পরিশোধ করায় বোর্ডের ১৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। বিল-ভাউচার, প্রাক্কলন, কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, সিসি ব্লক ম্যানুফ্যাকচারিং, ডাম্পিং রেজিস্টার ও টাস্কফোর্স কমিটির প্রতিবেদনসহ প্রাসঙ্গিক রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম পওর বিভাগ-২, চট্টগ্রাম কার্যালয়ে সন্দ্বীপ উপজেলার পোল্ডার নং-৭২-এর ভাঙনপ্রবণ এলাকা স্লোপ প্রতিরক্ষা কাজের মাধ্যমে পুনর্বাসন (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের প্যাকেজের কার্যাদেশে সিসি ব্লকের মোট সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৭২৮টি।

এর মধ্যে বিভিন্ন সাইজের ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬৯ টিসিসি ব্লকের বিল পরিশোধ করা হয়। কিন্তু টাস্কফোর্স কমিটি গুণগত মান যাচাই করে দেখতে পায় সিসি ব্লকের গৃহীত সংখ্যা ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৩৮টি। ফলে গুণগত মান যাচাই ছাড়াই ৮৭ হাজার ৫৪১টি ব্লকের মূল্য বাবদ ১২ কোটি ১৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকার বিল অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম পওর বিভাগ-১, চট্টগ্রাম কার্যালয় বাস্তবায়নাধীন চট্টগ্রাম জেলার উপকূলীয় এলাকার পোল্ডার নং-৬২ (পতেঙ্গা), ৬৩/১এ (আনোয়ারা), ৬৩/১বি (আনোয়ারা ও পটিয়া) পুনর্বাসন প্রকল্পের একটি প্যাকেজের কার্যাদেশে সিসি ব্লকের সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ২৩৫টি এবং ঠিকাদারকে ২১ হাজার ২৩৫টি বিল পরিশোধ করা হয়।

কিন্তু টাস্কফোর্সের গুণগত মান যাচাইকালে সিসি ব্লকের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৭৭৯টি। ফলে ৪ হাজার ৪৫৬টি ব্লকের মূল্য বাবদ ৬৪ লাখ ২১ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে। একইভাবে কুড়িগ্রাম কার্যালয়ের ‘কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী ও উলিপুর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর ভাঙন রোধ’ প্রকল্পের একটি প্যাকেজে টাক্সফোর্সের গণনায় গৃহীত নির্ধারিত সিসি ব্লকের সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ২৬৪টি। কিন্তু ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৩০০টি ব্লকের। ফলে এখানেও অতিরিক্ত ১৩ হাজার ৩৬টি ব্লকের মূল্য বাবদ ৬২ লাখ ১৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে।

অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন নির্বাহী প্রকৌশলী, রাঙামাটি পওর বিভাগের কাপ্তাই কার্যালয়ভুক্ত রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী উপজেলা ও কাপ্তাই উপজেলার কর্ণফুলী ও ইছামতিসহ অন্যান্য খালের উভয় তীরের ভাঙনরক্ষা প্রকল্প এবং পওর বিভাগ চট্টগ্রাম-২-এর সন্দ্বীপ উপজেলার, ৭২ নং পোল্ডারের ভাঙনপ্রবণ এলাকা স্লোপ প্রতিরক্ষা কাজের মাধ্যমে পুনর্বাসন প্রকল্পের ২০১৯-২০ অর্থবছরের কমপ্লায়েন্স অডিটে দেখা যায় সিসি ব্লকের সংখ্যা শূন্য হলেও বিল বাবদ ৬ কোটি ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সচিবালয়ের ২৩/০৬/২০১৪ তারিখের সংশোধিত দফতরাদেশ নং-২০০-পাউবো(সচি)/বোর্ড-২-এর নির্দেশনা অনুযায়ী টাস্কফোর্সের গণনা এবং মান যাচাইয়ের পর কাজ বাস্তবায়ন ও বিল পরিশোধযোগ্য। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ওই আদেশ মানা হয়নি।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন নির্বাহী প্রকৌশলী, ড্রেজার বিভাগ, চট্টগ্রাম ও মানিকগঞ্জ কার্যালয়ে ২০১৯-২০২০ সালে ড্রেজার পরিচালন কাজ না থাকা সত্ত্বেও দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মামনী এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স ডেভেলপার এসোসিয়েট নিয়োজিত অস্থায়ী শ্রমিকদের মজুরি বাবদ ১ কোটি ৭৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু ওই অর্থবছরে নির্বাহী প্রকৌশলী, ড্রেজার বিভাগ, চট্টগ্রাম ও মানিকগঞ্জ কার্যালয়ের অধীন কোনো ড্রেজিং কাজ করা হয়নি। ড্রেজিং কার্যক্রম না থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদার ৮৪ জন অস্থায়ী শ্রমিক কাজে নিয়োজিত দেখিয়ে মজুরি পরিশোধের নামে অর্থ লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ড্রেজার বিভাগ চট্টগ্রাম ৫৭ লাখ ৫৩ হাজার টাকা এবং মানিকগঞ্জ বিভাগ ১ কোটি ১৮ লাখ টাকা পরিশোধ দেখিয়েছে।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী, ড্রেজার বিভাগ, চট্টগ্রাম ও মানিকগঞ্জ কার্যালয় অডিট বিভাগকে লিখিত জবাবে জানিয়েছে জনবল স্বল্পতার কারণে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োজিত শ্রমিকদের দিয়ে ড্রেজার ও দাফতরিক কাজ পরিচালনা এবং বোর্ডের সম্পত্তির নিরাপত্তা প্রদান করতে হয় বিধায় অনিয়মিত শ্রমিক নিয়োজিত করা হয়েছে। এতে কোনো অনিয়ম হয়নি। তবে অডিট বিভাগ বলছে, ওই বছরে কোনো ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা ছাড়াই অস্থায়ী জনবলের মজুরি বাবদ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এবং এ ক্ষতির দায়-দায়িত্ব নির্ধারণপূর্বক সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ক্ষতির অর্থ আদায় করা আবশ্যক।

এদিকে ভাড়া দেওয়া ড্রেজার ফেরত না আনা এবং বকেয়া ড্রেজার ভাড়া ও নিরাপত্তা জামানত বাবদ অর্থ আদায় না করা সকারের ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ড্রেজারগুলো চুক্তির মাধ্যমে ভাড়া হিসেবে দেওয়া হয়। চুক্তিতে ভাড়ার হার, ভ্যাট-ট্যাক্স ও নিরাপত্তা জামানত অন্তর্ভুক্ত ছিল।

চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটির সঙ্গে তিনটি ড্রেজার ভাড়া চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দুটি ড্রেজার ভাড়া চুক্তির মেয়াদ চলমান। মেসার্স তিতাস ড্রেজিং কোম্পানির কাছে এসডি তিতাস-১৮ ইঞ্চি, মেসার্স পুলক এন্টারপ্রাইজের কাছে এসডি চন্দনা ১২ ও মেসার্স রঞ্জি কনস্ট্রাকশনের কাছে এসডি কর্ণফুলী-১২ ইঞ্চি ড্রেজার ১২ মাসের জন্য ভাড়া চুক্তি করা হয়। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো বকেয়া ভাড়া ও জামানত বাবদ তাদের টাকা পরিশোধ করেনি এবং ড্রেজারও ফেরত দেয়নি। বারাকা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের কাছে এসডি কুমার-১৮ ইঞ্চি ও এসডি ধলেশ্বরী -১৮ ইঞ্চি ড্রেজার ভাড়া দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক ভাড়া গ্রহণকারীকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও তারা ড্রেজার ফেরত দেয়নি।

চুক্তির ৮ নং শর্ত মোতাবেক চুক্তিপত্রের মেয়াদান্তে ড্রেজার ভাড়া গ্রহীতা নারায়ণগঞ্জ ড্রেজার বেজে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। তবে ভাড়া গ্রহণকারী যথাসময়ে ড্রেজার ফেরত না দিলে ড্রেজার বিভাগ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নারায়ণগঞ্জ ড্রেজার বেজে ফেরত আনবেন এবং সেই ক্ষেত্রে ভাড়া গ্রহণকারী ড্রেজার ডি-মবিলাইজেশন বাবদ প্রকৃত খরচ জামানতের টাকা থেকে সমন্বয় করবেন। অডিটের সময় পর্যন্ত বকেয়া ভাড়া আদায় করা ও ড্রেজারগুলো ফেরত আনা হয়নি।

তবে জবাবে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ড্রেজার ভাড়া নেওয়া মেসার্স রতি কনস্ট্রাকশনের অনুকূলে এসডি কর্ণফুলী-১২, মেসার্স পুলক এন্টারপ্রাইজের অনুকূলে এসডি চন্দনা-১২, মেসার্স তিতাস ড্রেজিং কোম্পানির অনুকূলে এসডি তিতাস-১৮ এবং বারাকা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের অনুকূলে এসডি কুমার-১৮ ও ধলেশ^রী-১৮ ইঞ্চি ড্রেজার ভাড়াবাবদ প্রাপ্য বকেয়া আদায়ের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বরাবর চিঠি দিয়ে একাধিকবার অনুরোধ করা হয়েছে। ভাড়া আদায়ের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

মন্তব্য / থেকে প্রত্যুত্তর দিন