
বান্দরবানের দূর্গম পাহাড়ে শিক্ষা বিস্তারে সেনাবাহিনীর স্কুল নির্মাণ
সোহেল কান্তি নাথ, বান্দরবান
বান্দরবানের দূর্গম পাহাড়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার আলো পৌঁছাতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এরই ধারাবাহিকতায় বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার আলেক্ষ্যং ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের চুয়ানবিল পাড়ায় বসবাসকারী পিছিয়ে পড়া স্থানীয় বম স¤প্রদায়ের শিশুদের মাঝে শিক্ষা আলো ছড়িয়ে দিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নির্মাণ করা হয়েছে চুয়ানবিল পাড়া প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয়। মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রæয়ারী) এই স্কুলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জোন কমান্ডার লেঃ কর্ণেল মাহমুদুল হাসান।
সরেজমিনে জানা যায়, জেলা সদর হতে ২০ কিঃমিঃ দুরত্বে রোয়াংছড়ি উপজেলার কচ্ছপতলী ও পরে সাধু হেডম্যান পাড়া হয়ে দুর্গম উঁচুনিচু পাহাড়ি পথে ২ ঘন্টা পায়ে হেটে যেতে হয় দুর্গম এই চুয়ানবিল পাড়ায়। দুর্গম এই এলাকাটিতে ২৫টি পরিবারে ১৪০ জন সদস্য বসবাস করছে যাদের মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ জন শিশু। ১৯৮০ সাল থেকে এই পাড়ায় কোন প্রাথমিক বা প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় শিশুরা দীর্ঘ বছর ধরে বঞ্চিত হচ্ছিলো শিক্ষা গ্রহনের মৌলিক অধিকার হতে।
কোমলমতি শিশুদের পড়ালেখার কথা চিন্তা করে বান্দরবান সেনা রিজিয়নের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বান্দরবান সেনা জোন এর নিরলস প্রচেষ্টার ফলে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি স্থাপন কাজ সম্পন্ন হয় "চুয়ানবিল পাড়া প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয়। নির্মিত এই বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক ১ম ও ২য় শ্রেণীতে শিক্ষা গ্রহণ করছে ১৫ জন ছেলে মেয়ে। আর এই সব শিশুদের পাঠদান করার জন্য দুই জন স্থানীয় শিক্ষকও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এদিকে দুর্গম এলাকায় স্থাপিত নিজেদের স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি" নিজ দেশের জাতীয় সংগীত মন খুলে গাইতে পারার আনন্দে ভাসছে স্কুলটির শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পাড়ার স্থানীয় জনসাধারণ।
চুয়ানবিল পাড়ার কারবারী মুন সাং বম বলেন, দেশ স্বাধীনের আগে পূর্ব পাকিস্তান আমলে সরকারি ভাবে এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও ১৯৮০ সালে অভ্যন্তরীন স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনের গ্রæপিংয়ের কারনে স্কুল সহ মানুষজন পার্শ্ববর্তী কচ্ছপতলী সরিয়ে নেয়। পরবর্তীতে মানুষজন এলাকায় ফিরে আসলেও স্কুলটি থেকে যায় কচ্ছপতলী এলাকায়। তিনি আরো বলেন, আমাদের এলাকার ছোট ছেলে মেয়েরা অ-আ লিখতে পারে না, সেনাবাহিনী এখানে স্কুল করে দিয়েছে এতে আমরা আজ অনেক খুশি। আমাদের ছেলে-মেয়েরা অন্তত নিরক্ষর থাকবে না আর। যেখানে দারিদ্রতার মাঝে দুর্গম এলাকায় নিজেদের দৈনন্দিন মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খেতে হয় সেখানে নিজেদের শিশুদের শিক্ষার উদ্দেশ্যে দীর্ঘপথ পায়ে হেটে পাড়ি দিয়ে কচ্ছপতলী এলাকা অথবা রোয়াংছড়ি সদরে যাতায়াত করা সম্ভব হয়ে উঠে না।
চুয়ানবিল পাড়ার আরেক বাসিন্দা মিরাম ময় বম বলেন, আমি অনেক দূরে গিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছি, যাতায়াতের দুরত্বের কারনে পড়ালিখা শেষ করতে পারি নি। সেনাবাহিনী এলাকায় স্কুল দিয়েছে, আমার ছেলে মেয়েরা এখন এখানে স্কুলে যেতে পারছে এ জন্য অনেক ভালো লাগছে।
বিদ্যালয়ের শ্রেনী শিক্ষিকা ডায়না বম বলেন, এখানের শিশুরা রোয়াংছড়ি সদর বা শহরে গিয়ে পড়ার সুযোগ পায় না। দীর্ঘদিন পর এখানে আমাদের জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় দিয়েছেন, সেজন্য সেনাবাহিনী কে ধন্যবাদ।
এ বিষয়ে বান্দরবান সেনা জোনের জোন কমান্ডার লে: কর্ণেল মাহমুদুল হাসান বলেন, বান্দরবানের দূর্গম অঞ্চল গুলোতে বসবাসকারী সকল স¤প্রদায়ের শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের এই উদ্যোগ। চুয়ানবিল পাড়ার দীর্ঘ বছর ধরে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিল কোমলমতি শিশুরা। এই বিদ্যালয় স্থাপনের ফলে এখন থেকে শিশুরা প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে। আগামীতেও এরুপ প্রতিটি ভালো উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলে জানান জোন কমান্ডার লেঃ কর্ণেল মাহমুদুল হাসান।